জাল নোটের অশুভ চক্র

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৭:৪৩ পিএম, ১৫ জুলাই ২০২১

ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে জাল নোট চক্রের সদস্যরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। জাল মুদ্রার প্রযুক্তি যে হারে সহজলভ্য হয়েছে তাতে অল্প সময়ের মধ্যেই সারা দেশেই ব্যাঙের ছাতার মতো  জাল নোট তৈরির কারখানা গজিয়ে উঠবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। রাজধানীতে জাল নোট তৈরির একটি কারখানার সন্ধান মিলেছে। যেখানে এক দম্পতি মিলে মিশে মাসে কয়েক কোটি টাকার জাল নোট তৈরি করতো। আর এক হাজার টাকার ১০০ জাল নোটের বান্ডেল অর্থাৎ ১ লাখ জাল টাকা তারা পাইকারিতে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করতো। গত সোমবার দুপুরে বাড্ডার নুরের চালা সাঈদ নগরের একটি সাততলা বাড়ির ষষ্ঠ তলায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ জাল নোট উদ্ধার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের গুলশান বিভাগ। সেখান থেকে গ্রেফতার করা হয় আব্দুর রহিম শেখ ও তার স্ত্রী ফাতেমা বেগম সহ আরো তিনজনকে। গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, এই কারখানাটি থেকে প্রায় ৪৩ লাখ টাকার জাল নোট ও এসব নোট তৈরির প্রচুর পরিমাণ উপকরণ মিলেছে। ঘরোয়া ওই কারখানাটির মালিক রহিম ও ফাতেমা মাসে কোটি কোটি টাকার জাল নোট তৈরি করতো।

 ফাতেমা ২০১৯ সালে হাতির ঝিল এলাকার একটি বাসায় জাল নোট তৈরির সময় অপর সহযোগী সহ হাতে নাতে ধরা পড়লেও তার স্বামী রহিম পালিয়ে গিয়েছিল। এরা সবাই জাল নোট তৈরি ও মাদকের কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ গ্রেফতার হয়েছিল বলে পুলিশ জানায়। এ কথা কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই যে, জাল নোটের প্রচলনটা ভয়ঙ্কর হিসেবে দেখা দিয়েছে। অত্যন্ত সুকৌশলে জালিয়াত চক্র এ কাজ করে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের কাগুজে মুদ্রার নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন করে ভাবা উচিত। অসচেতন সাধারণ মানুষের পক্ষে জাল নোট চিহ্নিত করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংক জাল নোট চিহ্নিতকরণের ব্যাপারে প্রায়ই বিজ্ঞাপন দিচ্ছে জনসাধারণকে সচেতন করার জন্য। জাল নোটের বিড়ম্বনা সারা বিশ্বেই রয়েছে এবং বাংলাদেশ এর বাইরে নয়।

 তবে দেশ ধীরে ধীরে ডিজিটালাইজড হওয়াতে এ প্রবণতা কমে আসবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। প্রতি বছর ঈদকে সামনে রেখে সক্রিয় হয়ে ওঠে জাল নোট তৈরির সিন্ডিকেট। এসব সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। এবারও তেমন কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সারা দেশের পশুর হাটে নোট শনাক্তকরণ বুথ স্থাপন করা হয়ে থাকে যা আমরা সব সময়ই দেখে আসছি। আমাদের কথা হলো, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে জাল নোট শনাক্ত করার কাজটি না হয় করা গেল, কিন্তু জাল নোট তৈরির প্রক্রিয়া বন্ধ করা যাবে কিভাবে? মূল সমস্যা তো নোট শনাক্তকরণ নয়, জাল নোট তৈরিই আসল সমস্যা। এ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে কিভাবে? প্রথমত: রাজধানীসহ সারা দেশে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত: জাল নোট তৈরির সঙ্গে অপরাধী গ্রেফতার হলে তার বিরুদ্ধে এমন আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে যথাযথ বিচারের আগে সে ছাড়া পেতে না পারে। জাল নোট সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনে কোন দুর্বলতা থেকে বঞ্চিত থাকলে তা দূর করতে হবে অবশ্যই। তৃতীয়ত: নোট ব্যবহারকারীদের সদা সতর্ক থাকতে হবে, যাতে তাদের কেউ জাল নোট গছিয়ে দিতে না পারে।

 জাল নোট বাজার হারালে এর কারিগররা নিরুৎসাহিত হবে বৈকি। জাল নোট চালানো যায় বলেই তা তৈরি করা হয়। সুতরাং বিশেষত ঈদের বাজার, কোরবানিরহাট ইত্যাদির ক্রেতা সাধারণ যদি টাকা লেনদেনের সময় সতর্ক থাকেন, তাহলে পরবর্তী সময়ে জাল নোট তৈরির প্রক্রিয়ায় ভাটা পড়বে। মুদ্রা জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতরা গ্রেফতার হলে আইনের ফাঁক ফোকরে জেল থেকে বেরিয়ে একই কাজে ফের সম্পৃক্ত হয়। আমরা মনে করি, এখন নতুন যে আইন হচ্ছে সেই আইনে বিচারের পদ্ধতি যেন সহজ হয়। তিন মাসের মধ্যে এসব অপরাধের বিচার সম্পন্ন করতে পারলে অপরাধীরা সাজা পাবে এবং এই অপরাধ কমে আসবে। সরকারের পরিকল্পিত ও কঠোর উদ্যোগই কেবল পারে জাল টাকার বিস্তার রোধ করতে।