মাটির জৈব ঘাটতি

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৬:৪৮ পিএম, ০৯ জুলাই ২০২১

কৃষি নির্ভর বাংলাদেশের জমির বিশাল অংশের জৈব উপাদানের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সময়ের ফসল সময়ে উৎপাদন হচ্ছে না। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা কৃষির অপরিকল্পিত নিবিড়করণ, পরিকল্পনাহীন শস্য আবর্তন, নানা উচ্চ ফলনশীল শস্যের চাষ বৃদ্ধি পাওয়ায় মাটিতে জৈব উৎপাদনের ঘাটতি হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলের মাটি এখন দূষণে নিষ্প্রাণ। ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম ও সিসার মতো ভারী ধাতু অতিরিক্ত মাত্রায় পাওয়া যাচ্ছে মাটিতে। খাদ্য চক্রের মাধ্যমে সেসব ক্ষতিকর উপাদান মানবদেহে প্রবেশের কারণে স্বাস্থ্য ঝুঁকির পাশাপাশি বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত চাষাবাদ, মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সারের ব্যবহার, ক্রমবর্ধমান নগরায়ন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ইটভাটার জন্য মাটির উপরিভাগের অংশ তুলে নেওয়া, শিল্পায়ন, দূষণ, ব্যাপকহারে বনভূমি ধ্বংস, পেট্রোলিয়াম চালিত গাড়ি এবং ইলেকট্রনিক ও মেডিকেল বর্জ্যরে কারণে মাটির স্বাস্থ্য দিন দিন খারাপ হচ্ছে। তিনটি গবেষণায় মাটি দূষণের ভয়ানক চিত্র উঠে এসেছে।

এগুলোতে বাংলাদেশের মাটি, ফসল, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় সতর্কতার ইঙ্গিত দেওয়া হলেও নেওয়া হয়নি কার্যকর পদক্ষেপ। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা প্রতিবেদন ২০১৯ সালে প্রকাশিত হয়। তারা কৃষি জমিতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে সর্বনিম্ন সাড়ে আট গুণ ও সর্বোচ্চ ৩৮ গুণ বেশি মাত্রার কোবাল্ট পেয়েছে। ক্রোমিয়ামের সর্বোচ্চ মাত্রা পাওয়া যায় সহনীয় মাত্রার তুলনায় ১১২ গুণ বেশি। পাওয়া যায় উচ্চ মাত্রার টিটেনিয়াম, ভেনাডিয়াম সহ ১১টি ভারী ধাতু। গত বছর মাটির উর্বরা শক্তি ও জৈব পদার্থের উপস্থিতি নিয়ে একটি গবেষণা চালিয়েছে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই)। ওই সমীক্ষায় মাটির উর্বরতা কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে মাটিতে জৈব পদার্থের ঘাটতি ও নানা পুষ্টিকণা কমে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, দেশে সব ধরনের বিশেষ করে আবাদি, বনভূমি, নদী, লেক, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, সুন্দরবন ইত্যাদি এলাকা মিলিয়ে জমির পরিমাণ এক কোটি ৪৭ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে ফসফরাস ঘাটতি যুক্ত এলাকার পরিমাণ ৬৬ লাখ হেক্টর, যা মোট জমির প্রায় ৪৫ শতাংশ। অন্য দিকে পটাশিয়ামের ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৫২ লাখ ৭০ হাজার বা ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ। সালফারের ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৬৫ লাখ ৩৫ হাজার হেক্টর বা ৪৪ দশমিক ২ শতাংশ এলাকায়। এর বাইরে বোরনের ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৫১ লাখ ১০ হাজার হেক্টরে (মোট জমির ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ)।

জৈব পদার্থের ঘাটতি রয়েছে এক কোটি ১৬ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর যা মোট জমির প্রায় ৭৮ দশমিক ৯০ শতাংশে। মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ৫ শতাংশ হলে সে মাটিকে সবচেয়ে ভালো বলা হয়। ন্যুনতম ২ শতাংশ থাকলে সেটিকে ধরা হয় মোটামুটি মানের। কিন্তু দেশের মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ এখন গড়ে ২ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। এ ছাড়া জৈব পদার্থের ঘাটতি রয়েছে প্রায় এক কোটি ১৬ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে, যা দেশের মোট জমির প্রায় ৭৯ শতাংশ। ইন্টার গভর্নমেন্টাল সায়েন্স পলিসি প্ল্যাটফরম অন বায়োডাইভারসিটি অ্যান্ড ইকোসিস্টেমের (আইপিবিইএস) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্ব জুড়ে প্রায় ৩২০ কোটি মানুষ মাটি দূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এক গ্রাম ওজনের মাটিতে ৪০ হাজার প্রজাতির মাইক্রো অর্গানিজম বা অণুজীব থাকতে পারে। মাত্রা পাঁচ বর্গকিলোমিটার মাটি সৃষ্টি হতে ১০০ বছরেরও বেশি সময় লাগে। পৃথিবীর জীব বৈচিত্র্যের প্রায় এক চতুর্থাংশের আবাসস্থল হচ্ছে মাটি এবং এটির অপরিহার্য উপাদান হচ্ছে মাটির জীব বৈচিত্র্য। কিন্তু ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণে নিবিড় চাষাবাদ, অপরিকল্পিতভাবে কৃষি জমি ব্যবহার, শিল্প-কলকারখানার সম্প্রসারণ, নগরায়ণ ইত্যাদি কারণে মাটির বাস্তুতন্ত্র দিন দিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের ২৫ ভাগের সরাসরি আবাসস্থল হলো মৃত্তিকা। প্রথমে মাটি দূষণের বিষয়টি সরকারকে বিশ্বাস করতে হবে, তারপর মনস্তাত্বিক পরিবর্তন আনতে হবে। মাটি দূষণের বিষয়টি সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা, নীতি ও বাজেটে অন্তর্ভূক্ত করার দাবি জানান বিশেষজ্ঞরা। মাটিতে বসবাসকারী অগণিত প্রজাতির অণুজীব শনাক্ত করার মতো বিশেষজ্ঞ ও অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। নীতিগতভাবে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিলে কয়েক বছরে এ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন হবে। ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ফসলি জমির মাটির স্বাস্থ্য ভালো রাখতে হবে। সুষম সারের ব্যবহার, অর্থাৎ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে জমিতে ঠিক কতটুকু পুষ্টি বা খাবারের অভাব আছে ততটুকু সার ব্যবহার করতে হবে। এতে একদিকে যেমন ফসল উৎপাদনে ব্যয় কমবে, তেমনি ভালো থাকবে মাটির স্বাস্থ্য, উৎপাদিত ফসলের খাদ্য মান এবং পরিবেশ।