জাল নোটের অশুভ চক্র

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৭:৫২ পিএম, ২৮ জুন ২০২১

প্রতি বছর ঈদকে সামনে রেখে সক্রিয় হয়ে ওঠে জাল নোট তৈরির সিন্ডিকেট। এসব সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। এবারও তেমন কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে আমরা দেখেছি সারা দেশের পশুর হাটে নোট শনাক্তকরণ বুথ স্থাপন করে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বিশেষ নির্দেশ দেয়া থাকে। ওই নির্দেশনায় বলা থাকে জাল নোট শনাক্তকারী মেশিনসহ বুথ স্থাপন ও বিনা খরচে নোট যাচাইয়ের সেবা নিশ্চিত করা হয়। আমাদের বিশ্বাস এমন পদক্ষেপে হাটগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সুবিধা হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এদিকে রাজধানীতে আবারও ধরা পড়েছে জাল টাকা তৈরির সরঞ্জামসহ বিপুল পরিমাণ জাল নোট। আসন্ন কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে পশুরহাট ও অন্যান্য বাজারে জাল টাকা ছড়িয়ে দিতে তৈরি করা হচ্ছিল এগুলো। ১ লাখ টাকার জালনোট মাত্র ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করে আসছিল চক্রটি। দুই তিন বছর ধরে এ কাজ করে এলেও সবশেষে র‌্যাবের হাতে ধরা পড়েছে একটি চক্রের সদস্য মোঃ নাইমুল হাসান তৌফিক।

সোমবার রাতে রাজধানীর বাড্ডা হাজি জয়নব উদ্দিন লেন এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে ৫০ লাখ ২৮ হাজার টাকার জাল টাকার নোট, এসব তৈরির কাজে ব্যবহৃত একটি ল্যাপটপ, একটি প্রিন্টার, একটি মোবাইল ফোনসেট ও ৪ হাজার ৮২০ আসল টাকা সহ জাল টাকা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। মঙ্গলবার বিকালে কাওরান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-১০ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোঃ মাহফুজুর রহমান বলেন, চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে যথারীতি মামলা হয়েছে। মুদ্রা জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতরা এ কাজে বেশ অভিজ্ঞ এবং তারা গ্রেফতার হলে আইনের ফাঁক-ফোকরে জামিন নিয়ে বেরিয়ে একই কাজে ফের সম্পৃক্ত হয়। তাদের স্বপ্ন রাতারাতি বিশাল বিত্ত বৈভবের মালিক হওয়া। তারা আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে বের হয়ে আবার একই কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। মুদ্রা জাল করার সঙ্গে জড়িত অধিকাংশই জামিনে বেরিয়ে আসছে। জাল মুদ্রার কারবারিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে মামলা হলেও অপরাধীদের অধিকাংশই খালাস পেয়ে যায়। বিশেষ ক্ষমতা আইনের এবং দন্ডবিধির কয়েকটি ধারায় জাল নোট তৈরি, সরবরাহ, ক্রয়-বিক্রয়ের সংশ্লিষ্ট কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা হয়ে থাকে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আসামিরা খালাস পেয়ে যায়। কারণ সাক্ষীর অভাব। যে এলাকা থেকে জাল নোটের কারবারিকে ধরা হলো সেই এলাকায় স্থানীয় কাউকে সাক্ষী করা হলো। সেই সাক্ষী দুই -একবার আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসার পর পরে আর আসে না। তো দেখা গেল সাক্ষীর অভাবে আসামি খালাস পেয়ে গেল। মুদ্রা জালকরণ, প্রস্তুত, ক্রয়-বিক্রয় সহ সংশ্লিষ্ট কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন ও দন্ডবিধির কয়েকটি ধারায় মামলা করা হলেও পুরানো আইনের দুর্বল ধারার কারণে অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যায়। জাল নোট তৈরির প্রক্রিয়া বন্ধ করা যাবে কিভাবে ? মূল সমস্যা তো নোট শনাক্তকরণ নয়, জাল নোট তৈরিই আসল সমস্যা। এ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে কিভাবে ? প্রথমত. রাজধানীতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, জাল নোট তৈরির সঙ্গে যুক্ত অপরাধী গ্রেফতার হলে তার বিরুদ্ধে এমন আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে যথাযথ বিচারের আগে সে ছাড়া পেতে না পারে। জাল নোট সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনে কোনো দুর্বলতা থেকে থাকলে তা দূর করতে হবে অবশ্যই। তৃতীয়ত, নোট ব্যবহারকারীদের সদা সতর্ক থাকতে হবে, যাতে তাদের কেউ জাল নোট গছিয়ে দিতে না পারে। জাল নোট বাজার হারালে এর কারিগররা নিরুৎসাহিত হবে বৈকি। জাল নোট চালানো যায় বলেই তা তৈরি করা হয়। সে জন্য টাকা লেন-দেনের সময় সতর্ক থাকতে হবে। এমনিতেই দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি খাতে আর্থিক অব্যবস্থাপনা ভর করেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির বেড়াজালে বন্দি হয়ে পড়েছে দেশের সাধারণ মানুষ। এমতাবস্থায় জাল নোটের ভয়াবহ বিস্তারে সাধারণ মানুষের সংকট আরো ঘনীভূত হবে। জাল নোটের ভয়াবহ বিস্তার রোধে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জাল মুদ্রা শনাক্তকারী মেশিন স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সরকার যদি জাল টাকা তৈরি চক্রের হোতাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে না পারে তবে দেশব্যাপী জাল নোটের ভয়াবহ বিস্তার রোধ করা সম্ভব হবে না।