আতঙ্কের নাম সড়ক

RezaDhaka RezaDhaka
প্রকাশিত: ০৭:৩২ পিএম, ২৪ অক্টোবর ২০২১

সড়ক দুর্ঘটনা আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোথাও সড়ক চলাচলে কোনো শৃঙ্খলা আছে বলে মনে হয় না। বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণের কোনো শৃঙ্খলা আছে বলে মনে হয় না। বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা নেই। চলছে অবৈধ যানবাহন। মূল্যবান প্রাণ যাচ্ছে সড়ক-মহাসড়কে। দেশে সড়ক পথ যেন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। আমাদের সড়ক-মহাসড়কগুলোকে যেন ইচ্ছা করেই মৃত্যুপুরীতে পরিণত করা হচ্ছে। এখানে কারো কোনো কর্তৃত্ব আছে বলে মনে হয় না। কারো যেন কোনো দায়িত্বও নেই। মানা হয় না ট্রাফিক আইন। ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী বহন, গতিসীমা মেনে না চলার পাশাপাশি সড়ক পারাপারে পথচারীদেরও নিয়ম মেনে না চলায় গত ছয় বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০ হাজার ৮৫৬ জনের প্রাণহানির তথ্য তুলে ধরেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির মহাসচিব মোঃ মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলছেন, এই ছয় বছরের হিসাব থেকে দেখা যাচ্ছে সড়ককে নিরাপদ করার কোনো প্রতিশ্রুতিই খুব একটা কাজ করছে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি জানান। সারা দেশে প্রতিদিন গড়ে ৬৪ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন আর আহত হচ্ছেন ১৫০ জনের বেশি। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে দেশে দুর্ঘটনার জন্য নিয়মিতভাবে সংরক্ষণ করে যাত্রী কল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল। তাদের হিসাবে গত ছয় বছরে ৩১ হাজার ৭৯৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় মোট ৪৩ হাজার ৮৫৬ জনের প্রাণ গেছে, আহত হয়েছেন ৯১ হাজার ৩৫৮ জন। ২০১৮ সালে রাজধানীর শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে সারা দেশে নজির বিহীন আন্দোলনের সূচনা করে শিক্ষার্থীরা। তাতে সরকার নতুন করে বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু তারপরও পরের বছর দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ২০১৮ সালে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭২২১ জনের মৃত্যু হয়েছিল, পরের বছর মারা গেছেন ৭৮৫৫ জন। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই ঢাকার বিমান বন্দর সড়কের এমইএস এলাকায় এক বাসের চাপায় নিহত হন রমিজ উদ্দিন কলেজের শিক্ষার্থী দিয়া খানম মিস ও আব্দুল করিম রাজীব। এর প্রতিবাদ জানিয়ে সারা দেশে আন্দোলনে নেমে কঠোর বিধান সংযোজন করা সহ নিরাপদ সড়কের দাবিতে নয় দফা দাবি ঘোষণা করে শিক্ষার্থীরা। ওই বছরের শেষে একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ২১টি বিশেষ অঙ্গীকারের মধ্যে নিরাপদ সড়কের প্রতিশ্রতিও রাখা হয়। মহাসড়কের পাশে অবস্থিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য আন্ডারপাস/ওভারপাস নির্মাণ করা হবে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় সেখানে। মোজাম্মেল হক বলেন, ২০২০ সালে করোনাভাইরাসের প্রকোপে দেশব্যাপী লকডাউনে পরিবহণ বন্ধ থাকার পরও ৪ হাজার ৮৯১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬ হাজার ৬৮৬ জনের প্রাণ গেছে। ‘জাতিসংঘ ২০১১ সাল থেকে ২০২১ সালকে সড়ক নিরাপত্তা দশক ঘোষণা করে সদস্য দেশগুলোর সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করেছিল। অনুস্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সে অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারেনি। এ কথা স্বীকার করতেই হবে, সড়কের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিংয়ের অভাব, টাস্কফোর্স প্রদত্ত ১১১টি সুপারিশ নামা বাস্তবায়ন না হওয়া, চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর প্রবণতা, দৈনিক চুক্তি ভিত্তিক গাড়ি চালনা করা, লাইসেন্স ছাড়া চালক নিয়োগ, পথচারীদের মধ্যে সচেতনতার অভাব, ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করে ওভারটেকিং করা, বিরতি ছাড়াই দীর্ঘ সময় ধরে গাড়ি চালানো, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানো বন্ধে আইনের প্রয়োগ না থাকা, সড়ক ও মহাসড়কে মোটর সাইকেল ও তিন চাকার গাড়ি বাড়ানো, মহাসড়কের নির্মাণ ত্রুটি, একই রাস্তায় বৈধ ও অবৈধ এবং দ্রুত শ্লথ যানবাহন চলাচল, রাস্তার পাশে হাট বাজার ও দোকানপাট এবং অশিক্ষিত ও অদক্ষ চালক, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, সড়ক পরিবর্তন আইন ২০১৮ বাস্তবায়ন না হওয়া ইত্যাদি এ বিপুল সংখ্যক দুর্ঘটনায় মূল কারণ। বড় বড় দুর্ঘটনা থেকে যদি আমরা শিক্ষা নিতে না পারি তবে ভবিষ্যতেও এর পুনরাবৃত্তি ঘটবে। দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার কমাতে হলে দোষীদের তাৎক্ষণিক শান্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনগণকেও নৌ, রেল ও সড়ক পথে ভ্রমণ ও রাস্তা পারাপারের ক্ষেত্রে আরও সচেতন হতে হবে। সরকারের পরিকল্পিত কঠোর উদ্যোগই কেবল পারে সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে। সড়ক নিরাপদ করতে সব ধরনের পদক্ষেপ জারি থাকুক এমনটি কাম্য।