সঞ্চয়পত্রের সুদ হার কমলো

RezaDhaka RezaDhaka
প্রকাশিত: ০৫:০৪ পিএম, ২৩ অক্টোবর ২০২১

সঞ্চয়পত্রকে সুবিধা বঞ্চিত মানুষের সামাজিক নিরাপত্তার জন্য একটি উত্তম উপায় বলা হলেও এখানে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম। মূলত সরকারি চাকরিজীবীরা অবসরের পর বিপুল পরিমাণ টাকা সঞ্চয় পত্রে বিনিয়োগ করেন। কেউ আবার অলস টাকায় সঞ্চয়পত্র কিনে সরকারের ঋণ বাড়ান বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। তবে মধ্যবিত্তদের একটি অংশ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে উৎসাহী। বিশেষ করে ব্যাংক সঞ্চয়ে সুদের হার কমে আসায় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন অনেক মধ্যবিত্ত। ফলে কিছুদিন থেকে সঞ্চয়পত্রের চাহিদাও বেড়েছিল। কিন্তু মঙ্গলবার সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার পুনর্বিন্যাস করার পর মধ্যবিত্ত শ্রেণির নাগরিকদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করতে সঞ্চয়পত্রে ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফা কাটছাঁট করা হয়েছে। আর ৩০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ করলে লাভ কমবে সবচেয়ে বেশি। যদিও পুরনো বিনিয়োগকারীরা আগের হারে মুনাফা পাবেন। যারা এসব সঞ্চয়পত্রে নতুন বিনিয়োগ করবেন, তাদের ক্ষেত্রে মুনাফার নতুন হার প্রযোজ্য হবে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ সঞ্চয়পত্রের নতুন মুনাফার হার পুনর্বিন্যাস করে গত মঙ্গলবার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোয় সরকারের সুদ ব্যয়ে প্রভাব পড়বে। সব মিলিয়ে সরকারের সুদ ব্যয় কমবে তিন হাজার কোটি টাকা। সুদ হার কমানো এবং বিক্রিতে ভাটার কারণে এই অর্থ সাশ্রয় হতে পারে। এতে অর্থ বছর শেষে এ খাতে সরকারের ব্যয় কমে ৩৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে পত্র পত্রিকা এ খবর জানায়। সূত্র মতে, গত ২১ সেপ্টেম্বর সরকার সার্কুলার জারি করে ১৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কেনায় সুদহার কমিয়েছে। নতুন নিয়মে পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে সুদ পাওয়া যাবে ১০.৩০ শতাংশ হারে। আর ৩০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ থাকলে মুনাফার হার হবে সাড়ে ৯ শতাংশ। তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক তিন বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্রে মুনাফা পাওয়া যাবে ১০ শতাংশ। এই সঞ্চয়পত্রে ৩০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মেয়াদ শেষে মুনাফা পাওয়া যাবে ৯ শতাংশ হারে। পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্রে মেয়াদ শেষে মুনাফার হার ১০.৭৫ শতাংশ পাওয়া যাবে। আর ৩০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে এই হার হবে ৯.৭৫ শতাংশ। দেশে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় পরিবার সঞ্চয়পত্র। এই সঞ্চয়পত্রে ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফা পাওয়া যাবে সাড়ে ১০ শতাংশ। আর ৩০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই হার সাড়ে ৯ শতাংশ হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ সূত্র জানায়, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর কারণে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে পরিবার সঞ্চয়পত্রে। এই সঞ্চয়পত্রই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। সুদও পাওয়া যায় ভালো। নতুন সুদ হারের কারণে এর বিক্রি ৫-১০ শতাংশ কম হতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কর্মকর্তারা বলছেন, অভিযোগ রয়েছে, এ সঞ্চয়পত্রে সরকারি চাকরিজীবীসহ অনেক উচ্চ মধ্যবিত্তও বিনিয়োগ করে। নতুন হারে তাদের বিনিয়োগে অনীহা বাড়বে। যদিও নতুন হার বেশির ভাগ ব্যাংকের সুদ হারের চেয়ে বেশি। এ ছাড়া তিন মাস অন্তর মুনাফা ভিত্তিক, পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্রেও ভালো প্রভাব পড়তে পারে। তবে পেনশনার সঞ্চয়পত্রের বিক্রিতে খুব বেশি প্রভাব পড়বে না। এর মুনাফার হার কমানোর কারণে সরকারের ব্যয় কিছুটা কমতে পারে এ সঞ্চয়পত্রে। ২০২১-২২ অর্থ বছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে সরকার ৩২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছে। তবে এ খাতে সুদ পরিশোধের জন্য সরকার ৩৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। প্রসঙ্গত, সাধারণ ব্যবসায়ীদের কাছে যেটা বিনিয়োগ, সরকারের জন্য সেটা ঋণ। সঞ্চয়পত্র বিক্রির অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা থাকে। সরকার পরে তা রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজে লাগায়। এর বিনিময়ে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের প্রতি মাসে সুদ দিতে হয়। এ কারণে অর্থনীতির পরিভাষা সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিকে সরকারের ‘ঋণ’ হিসেবে গণ্য করা হয়। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বিনিয়োগের নিরাপদ ক্ষেত্র প্রস্তুত না করে আকস্মিক এ সিদ্ধান্ত মধ্যবিত্তরা বিপাকে পড়বেন। সাধারণ মানুষের নিরাপদ ও লাভজনক বিনিয়োগের ক্ষেত্র বলতে শুধু সঞ্চয়পত্র। ব্যাংকে আমানত রাখলে ৫ শতাংশের নিচে মুনাফা। ফলে এত কম লাভে ব্যাংকে টাকা রাখায় আগ্রহী নন সাধারণ মানুষ। পুঁজিবাদের কোনো স্থিতিশীলতা নেই। পুঁজির নিরাপত্তা নিয়ে চরম ঝুঁকি। তাই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বেশির ভাগই সেখানে বিনিয়োগে আগ্রহী নন। বিশেষ করে মধ্যবিত্তের বিনিয়োগের পছন্দের জায়গা সঞ্চয়পত্র অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী, প্রবাসী বা সাধারণ মানুষ তাদের শেষ সম্বল এই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে ওই মুনাফা দিয়ে সংসার চালান। ব্যাংকের সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের সুদ বা মুনাফার সমন্বয় সাধন করতে গেলে সাধারণ মানুষের বিনিয়োগের কোনো জায়গাই থাকবে না। এ ব্যাপারে সরকারের আরো ভাবনা আমলে নেওয়া উচিত।