সড়কে ভেজাল বিটুমিন

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ১২:৪৫ এএম, ০৫ জুন ২০২১

প্রতিদিনই রক্তে ভিজছে দেশের সড়ক ও মহাসড়ক। অকালে ঝরে পড়ছে প্রাণ। দুর্ঘটনায় নিহত স্বজনদের বাড়ি বাড়ি পড়ছে কান্নার রোল। এমনও আছে একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ছে অসংখ্য পরিবার। নিম্নমানের বিটুমিন দিয়ে সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের কারণে দেশে এমন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে সড়ক দুর্ঘটনা। আর এভাবে গত তিন বছরে শুধু সড়কে প্রাণ গেছে ১৪ হাজার ৬৩৫ জন মানুষের। গণমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, নিম্নমানের বিটুমিনের কারণে অল্প সময়েই ভেঙে যায় সড়ক। আর এসব খানাখন্দে ভরা সড়কের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে গড়ে সাড়ে চার হাজার। এসব সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর গড়ে প্রাণ হারায় পাঁচ হাজার মানুষ। দেশে ভয়ংকর হয়ে উঠছে বিটুমিন সিন্ডিকেট চক্র। জানা গেছে এ চক্র আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ নিম্নমানের বিটুমিন আমদানি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলছে। ওই বিটুমিনে তৈরি রাস্তা ছয় মাসেই ভেঙে হয় খান খান। সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করলেও সিন্ডিকেটের লুটপাটে হয় বদনাম। কারণ বিএসটিআই, বিপিসির অনুমোদন নেয় না সিন্ডিকেট, নীরবেই খালাস দেয় কাস্টমস।

এরপর সেই নিম্নমানের বিটুমিনে ড্রামে ড্রামে মেশানো হয় ভেজাল। ঠিকাদারদের কাছে কম দামে বিক্রি হয় ভেজাল বিটুমিন। এ পরিস্থিতি উত্তরণে বিটুমিন মাফিয়াদের বিরুদ্ধে বিইআরসির কঠোর অ্যাকশন দেখতে চান অংশীজনেরা। জানা গেছে, বিদেশ থেকে জাহাজে করে পরিবহণের সময় বিটুমিনের সঙ্গে নিম্নমানের অবশিষ্টাংশ বা কাদা, পানি ও অন্য দূষিত পদার্থ মিশ্রিত হয়। সমুদ্র যাত্রাকালে দীর্ঘ সময় ধরে তাপে থাকা বিটুমিনের গুনাগুন ও বৈশিষ্ট্যগুলো বদলে যায়। যে সময় পর্যন্ত একটি পণ্য ব্যবহারের উপযোগী থাকে, সেই সময়কে এই পণ্যের শেলফ লাইফ বলা হয়। শেলফ লাইফ অতিক্রান্ত হওয়ার পর পণ্যের গুণগতমান হ্রাস পায়। আমদানি করা বিটুমিনের ক্ষেত্রে আমরা এর শেলফ লাইফ সম্পর্কে জানিনা। বাংলাদেশে ব্যবহৃত আমদানি করা বিটুমিন প্রস্তুতি, আমদানি ও বন্টনের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে আসে। সুতরাং আমদানি করা বিটুমিনের গুণমান নিশ্চিত করা যায় না। গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডু থেকে বাড়ৈয়ারহাট এলাকায় ৮ থেকে ১০টি মিলে বিটুমিনের ড্রামে ভেজাল মেশানো হয়। ফেনী থেকে মিরসরাইয়ে কয়েকটি স্থানে বিটুমিনে ভেজাল মেশানো হয় প্রকাশ্যে। এসব মিলে বিটুমিনের সঙ্গে মাটি, বালু মিশিয়ে বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে এতে তৈরি রাস্তা এক থেকে ছয় মাসেই ভাঙছে। সে ভাঙা সড়কে ঝুঁকি নিয়ে চলছে যানবাহন। বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। দেশের প্রায় ৪৫টি জেলায় শত শত সড়কের বিভিন্ন জায়গা দেবে গেছে কিম্বা খানাখন্দ তৈরি হয়েছে।

এসব রাস্তা সংস্কারের কাজও চলছে। খোলা ড্রামে, পুরনো আমলের প্রযুক্তি ব্যবহার করে, আগুনে পুড়িয়ে গলানো হচ্ছে বিটুমিন। বিটুমিন গরম করার আদর্শ তাপমাত্রা হলো সর্বোচ্চ ১৫০ থেকে ১৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু এখানে আদর্শ দূরে থাক, তাপমাত্রা মাপারই ব্যবস্থা নেই। আর বেসরকারিভাবে আমদানি হওয়া নকল ও নিম্নমানের বিটুমিনের কারণেই বাংলাদেশের ৬০ থেকে ৭০ ভাগ রাস্তা নির্মাণের ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এদিকে নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহারের ফলে বছর বছর লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সড়কের নির্মাণ ব্যয়। সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সওজের অধীনে থাকা সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ, মেরামত ও প্রশস্তকরণে ৫৭ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এ সময় প্রশস্ত ও মজবুত করা হয়েছে পাঁচ হাজার ১৭৯ কিলোমিটার সড়ক। ১৪ হাজার ৯১৯ কিলোমিটার সড়কে বিভিন্ন ধরনের মেরামত করা হয়েছে। খবরে প্রকাশ, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ভাঙা চোরা এবং দেবে যাওয়ার খবর দিয়েছে গণমাধ্যম। সম্প্রতি চার লেনে উন্নীত দেশের জাতীয় মহাসড়কটির বিভিন্ন অংশ দ্রুত ভেঙে যাওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন এ সড়কে নিয়মিত চলাচলকারী চালক এবং যাত্রীরা। সড়কে মৃত্যু থামাতে মানসম্মত বিটুমিন দিয়ে রাস্তা নির্মাণের বিকল্প নেই। রাস্তা যত বেশি টেকসই হবে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার ঘটনা ততই কমে আসবে।