এমএলএম প্রতারণা

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৭:১৭ পিএম, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

বাংলাদেশে বহুধাপ বিপণন বা মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিভিন্ন সংস্থার দ্বারা বহু বছর ধরে প্রচুর সংখ্যক মানুষ স্বল্প বিনিয়োগে অধিক মুনাফার লোভে প্রতারিত হয়েছেন। এ ক্ষেত্রে সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ছিল না। আর নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণ ছিল এ সম্পর্কিত একটি আইনের অভাব। তাই প্রশাসনের চোখের সামনেই ভুয়া এনজিও, এলএলএম ও ভুঁইফোড় কোম্পানিগুলোর প্রতারণা-জালিয়াতি সামনে চললেও তা দেখার কেউ নেই। সাধারণ মানুষের আমানত লুটে নিয়ে রাতারাতি উধাও হয়ে যাচ্ছে এসব ‘হায় হায় কোম্পানি’। প্রতারক চক্র কোটি কোটি টাকা লুটে নেওয়ার পর পত্র-পত্রিকায় হৈ চৈ হলেই সরকারি সংস্থাগুলো নড়ে চড়ে ওঠে। লোক দেখানো কয়েকদিন তদন্ত চলে, এক পর্যায়ে সব কিছুই চাপা পড়ে যায়। শুধু থামে না সর্বস্ব হারানা লোকজনের হাহাকার। দেশজুড়ে গড়ে উঠেছে বিপুল সংখ্যক মাল্টি লেভেল মার্কেটিং বা এমএলএম কোম্পানি। ২০০২ সালে দেশে এমএলএম কোম্পানি ছিল ১৬টি, ২০০৬ সালে তা বেড়ে দাড়ায় ২৪টিতে। বর্তমানে সরকারি হিসেবে ৬৯ এমএলএম কোম্পানির অনুমোদন থাকলেও বাস্তবে ২ শতাধিক কোম্পানি ‘কাজ’ করছে। এসব ছাড়াও প্রতারণার বিষমন্ত্রকে সম্বল করে বিভিন্ন দেশ থেকে নতুন নতুন সংস্থা বাংলাদেশে আসে। তারাও মাল্টি পারপাসের আদলে সার্টিফিকেট জোগাড় করে সাজায় প্রতারণার পসরা। 

পত্র-পত্রিকার খবর অনুযায়ী জানা যায়, গত এক সপ্তাহেই অন্তত দুটি কোম্পানি বিপুল সংখ্যক গ্রাহকের প্রায় তিন শ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়েছে। পাঁচশ টাকা থেকে শুরু করে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছেন প্রায় ১২ লাখ গ্রাহক। বিপুল অংকের টাকা নেওয়ার পরই ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট সহ সবকিছু স্থায়ীভাবে বন্ধ করে লাপাত্তা হয় এসব কোম্পানি। প্রতারণার শিকারদের বেশির ভাগই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। লকডাউনের মধ্যে কিছুটা আয়ের আশায় এসব অনলাইন এমএলএম কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে ভুক্তভোগীরা এখন হা-হুতাশ করছেন। স্মর্তব্য, ২০১৩ সালের অক্টোবরে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়ন করা হয়। ওই আইনে এমএলএম পদ্ধতিতে ব্যবসার জন্য লাইসেন্স নেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করে তা দেওয়া হয়, রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানি অ্যান্ড ফার্মসকে। এ আইনের অধীনে যারা লাইসেন্স পেয়েছে, তারা যেমন স্বচ্ছভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে না, তেমন বৈধ অনুমতি না নিয়েও অলীক স্বপ্ন দেখিয়েও অনেকে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে। দুর্নীতি একটি বৈশ্বিক প্রবণতা হলেও উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে যে, সুশাসন ও আইনের শাসনকে অর্থবহ করতে হলে দুর্নীতির রাস টানার বিকল্প নেই। দু:খজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনিয়ম ও দুর্নীতি সংক্রামক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। ফলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

 সম্প্রতি সচিব সভায় দুর্নীতির বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের হুঁশিয়ার করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেশে আমরা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাই। যেহেতু অনেক সুযোগ সুবিধা দিচ্ছি, অর্থনৈতিকভাবে অগ্রগতি হচ্ছে এ জন্য কোনো ধরনের দুর্নীতি সহ্য করব না। সেটি মাথায় রেখে কাজ করতে হবে। যেখানে দুর্নীতি দেখবেন সেখানেই ব্যবস্থা নিতে হবে। যারা ভালো কাজ করবেন অবশ্যই তারা পুরস্কৃত হবেন। আমরা বিশ্বাস করতে চাই প্রধানমন্ত্রী যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সেই অনুযায়ী তিনি কাজ করবেন। যে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতির যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণ ও শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে সবার জন্য একটি কঠোর বার্তা দেওয়া সম্ভব হবে। আমরা আশা করব, ২০১৩ সালের নতুন আইনের অধীনে লাইসেন্স গ্রহণকারী এমএলএম কোম্পানিগুলোর কর্মকান্ড তীক্ষè মনিটরিংয়ের আওতায় হবে, যাতে তারা কোনো প্রতারণামূলক কাজে লিপ্ত হতে না পারে। সাধারণ মানুষ যেন আবারও এদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আবারও যেন কোনোভাবেই প্রতারণামূলক এমএলএম ব্যবসার সাম্রাজ্য তৈরি হতে না পারে। আইনটির কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে যেন চির অবসান ঘটে এমএলএম প্রতারণার-এটাই কাম্য।