মানব পাচার থামছে না

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৭:৪১ পিএম, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২১

মানবপাচার একটি বৈশ্বিক সমস্যার নাম। বিশ্বের গরিব দেশগুলোই এ সমস্যার নিত্যকার শিকার। বাংলাদেশের মানুষও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের প্রতি ১৭ জনের একজন এখন বিদেশে কর্মরত। বিদেশে প্রায় এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে।  এ ব্যাপারে জনশক্তি রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান যেমন অনস্বীকার্য তেমন আদম ব্যাপারী নামের প্রতারকদের প্রতারণাও অনেক বিয়োগান্ত ঘটনার জন্ম দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, ইউরোপসহ পৃথিবীর অনেক দেশে বাংলাদেশিরা জীবিকায় নিয়োজিত আছেন। কেউ আবার স্থায়ীভাবেও বিদেশের মাটিতে বসবাস করছেন। এমনই একটি রীতি গড়ে উঠেছে দেশে। মানব পাচারকারীদের পাল্লায় পড়ে এ দেশের শত শত শিশু এক সময় মধ্যপ্রাচ্যে উটের দৌড় প্রতিযোগিতায় জকি হতে বাধ্য হয়েছে। এদের কেউ কেউ দৌড় প্রতিযোগিতার সময় আতঙ্কে প্রাণ হারিয়েছে। ইউরোপে কর্মসংস্থানের আশায় ঝুঁকিপূর্ণ পথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়ার সময় অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন জাহাজ বা নৌকা ডুবিতে। ইউরোপ যাওয়ার জন্য মানবপাচারকারী চক্রের কাছে জনপ্রতি গড়ে ১০ লাখ জমা দিয়েছেন। টাকা দিয়ে তারা নিজেদের অজান্তে কিনেছেন মৃত্যুর টিকিট। ইউরোপ যাওয়ার পথে সাহারা মরুভূমি পাড়ি দিতে গিয়ে বেঘোরে প্রাণ হারিয়েছেন অনেক যুবক। মালয়েশিয়ায় চাকরির আশায় অবৈধ পথে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ট্রলারডুবিতে কত অসহায় মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে তার হিসাব নেই। 

পাচারকারীদের পাল্লায় পড়ে থাইল্যান্ডের গহিন জঙ্গলে পণবন্দি হয়ে জীবন দান কিংবা ক্রীতদাসের জীবনবরণ করার ঘটনাও কম নয়। এ ছাড়া বিদেশে চাকরি দেয়ার নামে লাখ লাখ টাকা নিয়ে উধাও, চাকরি না দিয়ে প্রতারণা শুধু নয়, জীবন কেড়ে নেয়ার ঘটনাও অনেক ঘটেছে। উল্লেখ্য তথ্য বাংলাদেশি এসব চক্রের সঙ্গে বিদেশীদের চক্রের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রয়েছে। পত্র-পত্রিকার খবরে প্রকাশ্য ইউরোপে পৌঁছার উদ্দেশ্যে যেন তেন নৌকায় চরম ঝুঁকি নিয়ে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ইতালির উপকূলে ভাসতে থাকা পাঁচ শতাধিক অভিবাসন প্রত্যাশীকে উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি রয়েছেন। ইতালির কর্তৃপক্ষ গত রোববার জানিয়েছেন, তাদের কোষ্টগার্ড ল্যাম্পেদুসা দ্বীপের কাছ থেকে নারী-শিশুসহ ৫৩৯ অভিবাসন প্রত্যাশীকে উদ্ধার করেছে। ডক্টরস উইদাউট বর্ডারসের চিকিৎসক আলিডা সেরাচিয়েরি জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া অভিবাসন প্রত্যাশীদের মধ্যে বেশির ভাগ উত্তর ও দক্ষিণ আফ্রিকা এবং বাংলাদেশের নাগরিক। তাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে। 

আলিডা সেরাচিয়েরি আরও জানিয়েছেন, এর মধ্যে কয়েকজন সাগরভাসা পাচাকারীদের হাতে মারাত্মক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ইউরোপে আসতে লিবিয়ায় নৌকার জন্য অপেক্ষায় থাকা অবস্থাতেই তারা সহিংসতার শিকার হন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্তত ২০ জনের শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে। তাদের সঙ্গে লিবিয়ায় ঠিক কী হয়েছে, তা খতিয়ে দেখছেন ইতালির তদন্তকারীরা। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা জানান ভাগ্যের খোঁজে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপের উদ্দেশ্যে ভয়ংকর যাত্রার সময় প্রতি বছর বহু মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। এর মধ্যে বেশির ভাগই মারা যান ভূমধ্যসাগরে কাঠের বা রাবারের নৌকায় ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার সময়। এর আগেও ১ আগস্ট ভূমধ্যসাগর থেকে বাংলাদেশি সহ ৩৯৮ জনকে উদ্ধার করা হয়। ভূমধ্যসাগরে বিপজ্জনকহারে কাঠের নৌকায় ভাসতে থাকা অভিবাসীদের উদ্ধার করে জার্মানি ও ফ্রান্সের দুটি উদ্ধারকারী জাহাজ। উদ্ধারকৃত অভিবাসন প্রত্যাশীদের বেশির ভাগই বাংলাদেশ, মরক্কো, মিসর ও সিরিয়ার নাগরিক। মানবপাচার একটি জঘন্য অপরাধ। এ ঘৃণ্য অপরাধে যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে বিচারের মাধ্যমে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা উত্তম। যেহেতু জীবন ও জীবিকার কারণে দেশে কর্মসংস্থানের অভাবে, দারিদ্র্যের পীড়নে, সচ্ছল জীবন যাপনের লক্ষ্যে মানুষকে দেশান্তরী হতে হচ্ছে, সেহেতু তাদের গমনাগমন যাতে নিরাপদ হয় তা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে।