মহামারিতে সুষম খাদ্য সমস্যা

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ১০:১৮ পিএম, ০৮ মে ২০২১

আমরা খাবার খাই বেঁচে থাকার জন্য। অথচ মহামারীকালে অনেকেরই খাবার সংস্থান করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকেই কাজ হারিয়েছেন। প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা মহামারীকালে নতুন কাজ অনেকেই জোগাড় করতে পারেননি। অনেকের আয় কমেছে। কর্মক্ষেত্রে কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ায় বেতন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। জীবন ধারণের জন্য যথেষ্ট রোজগার না থাকায় বাধ্য হয়ে অনেককেই রাজধানী থেকে ফিরে যেতে হয়েছে নিজ এলাকায়। কর্মহারানো এবং আয় কমে যাবার ফলে স্বাভাবিকভাবেই টান পড়েছে খাদ্যসংগ্রহেও। অধিকাংশ মানুষের হাত পড়েছে সঞ্চয়ে। নি¤œবিত্ত তো বটেই মধ্যবিত্তেরও সঞ্চয়ের পরিমাণ সামান্য। কারো কারো সেই সঞ্চয় তলানিতে, কারো কারো তা শূন্যের কোঠায়। এতে করে ক্রমশ দুর্বিষহ হয়ে উঠছে জীবন। করোনা মাহামারী সামাল দিতে ঘরে থাকাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এতে করে সংক্রমণ ঝুঁকি কমবে। কিন্তু জীবন বাঁচাতে এখন জীবিকাও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। জীবিকা না থাকলে ঘরে থেকে জীবন রক্ষা করা কঠিন। ঘরে করোনার সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেলেও ক্ষুধার প্রকোপ থেকে মুক্তি নেই। ফলে ঘরে থাকার জন্য নানান প্রচারণার পরেও বাধ্য হয়ে শ্রমজীবী মানুষকে বাইরে আসতে হচ্ছে। জীবিকার সন্ধান করতে হচ্ছে। কিন্তু এই বিমুখ সময়ে সবই যখন গুটিয়ে নেওয়া তখন কাজের সন্ধান মরিচিকার পেছনে ছোটার মতোই। যাতে করে মানুষের মাঝে পুষ্টিহীনতার অভাবও প্রকট হয়ে উঠছে। দীর্ঘ মহামারির প্রভাবে যখন মানুষের আয়-রোজগার নেই, ক্রমশ কমছে সঞ্চয় সেখানে সুষম খাবারের সন্ধান অনেকের জন্যই প্রহেলিকা। সাধারণ খাবার জোগানই যেখানে কঠিন সেখানে পুষ্টির চাহিদা মেটানোকেও অনেকেই অসম্ভব মনে করছেন। হাতে টাকা না থাকায় মানুষ যেমন সুষম খাদ্য নিশ্চিত করতে পারছে না, তেমনি অসুখ-বিসুখে ডাক্তার দেখানোর সামর্থ্যটুকুও হারিয়ে ফেলেছে।

সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে একটি পরিসংখ্যান উল্লেখ করে বলা হয়েছে, করোনায় দেশের অতি ধনী এক-চতুর্থাংশ মানুষের বাইরে সবারই আয় কমেছে। এছাড়াও অন্যান্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় খাবার বাবদ ব্যয়ও কমাতে হয়েছে এসব মানুষকে। আয় কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার খাবার গ্রহণের পরিমাণ কমিয়েছে বলেও বিভিন্ন  সরকারি ও বেসরকারি গবেষণায় উঠে এসেছে। সংবাদ মাধ্যম বলছে, খাদ্য তালিকা থেকে অনেকই আমিষ, ফল বা অন্যান্য উপকরণ বাদ দিয়েছে। অনেক পরিবারে সাধারণ খাবারও কম খাওয়া হচ্ছে। আর খালি পেটে ঘুমাতে যাওয়া মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে ক্রমেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘আরবান সোসিও-ইকোনমিক সার্ভে’র সাম্প্রতিক একটি গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, করোনায় প্রায় ৩৯ শতাংশ মানুষ খাবার ব্যয় কমিয়ে মহামারিকালে বর্ধিত ব্যয়ের জোগান দেওয়ার চেষ্টা করছে। এছাড়াও ২২ শতাংশ পরিবার কম খাবার খায়, আবার ১৭ শতাংশ পরিবার গ্রহণ করে নি¤œমানের খাবার। মহামারির শুরুতে এসব পরিবার স্বাভাবিক ও সুষম খাবার গ্রহণ করত বলেও গবেষণায় ওঠে এসেছে। শহর অঞ্চলে খাবার কেনার টাকা নেই এমন মানুষের হার ১১ দশমিক ৫১ শতাংশ। আর খালি পেটে ঘুমাতে যায় ৮ দশমিক ২২ শতাংশ মানুষ। পরিসংখ্যানের এই তথ্য সবার জন্য বেদনার। একই সঙ্গে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষের অসহায়ত্বও। করোনাকাল দীর্ঘায়িত হলে তীব্র অপুষ্টির শিকার পরিবার ও মানুষের সংখ্যা বাড়বে। অপুষ্টির শিকার মানুষ ক্রমশ হারাবে কর্মক্ষমতা। এ অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে এখনই উদ্যোগ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে সুষম খাদ্য নির্বাচনের বিষয়ে সচেতন করতে হবে। শরীর সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখতে পুষ্টিকর খাদ্যের বিকল্প নেই। আমাদের মনে রাখতে হবে পুষ্টি পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার পেছনে অর্থনৈতিক কারণই বড় নয়, এক্ষেত্রে আমাদের পুষ্টি ও খাদ্য নিয়ে জ্ঞানের অভাবই দায়ী। অনেকে না জেনে বেশি দামে কম পুষ্টিকর খাবার কেনে। তাই পুষ্টিকর খাবার সম্পর্কে মানুষের ধারণা বাড়াতে উদ্যোগ জরুরি। সরকারের তরফ থেকে প্রচারণা বাড়াতে হবে। কোন খাবারে কি পরিমাণ পুষ্টিগুণ তা জানানোর মাধ্যমে মানুষ যেন সীমিত ব্যয়ে বেশি পুষ্টিকর খাবারের সংস্থান করতে পারে সেদিকটি নিশ্চিত করতে হবে। জনগণকে পুষ্টিকর খাবার দিতে না পারলে বিকলাঙ্গ ভবিষ্যৎ ও বিকলাঙ্গ সমাজ গড়ে ওঠবে। যা সামাজিক সুরক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।