নৌ দুর্ঘটনার কি শেষ নেই?

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৬:১৫ পিএম, ০৪ মে ২০২১

দুর্ঘটনাটি ঘটেছে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় বাংলাবাজা ফেরিঘাটের পুরোনো কাঁঠালবাড়ি ঘাটে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, যাত্রীবোঝাই একটি স্পীডবোট মুন্সিগঞ্জের শিমুলিয়া থেকে বাংলাবাজার ফেরিঘাটের দিকে যাবার পথে কাঁঠালবাড়ি ঘাটের কাছাকাছি এলে বালুবোঝাই একটি বাল্কহেডের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। স্পডীবোটটি উল্টে যায়। এই সম্পাদকীয় লেখা পর্যন্ত দুর্ঘটনাস্থল থেকে ২৬ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। জীবিত পাঁচজন উদ্ধার হলেও এখনো নিখোঁজ বেশ কয়েকজন। উদ্ধারকাজ চলছে। কী ভাবে ঘটল এই দুর্ঘটনা? তা তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে আসবে। কিন্তু কেন প্রতিনিয়ত এরকম মর্মান্তিক দুর্ঘটনা? এমন অপমৃত্যুর কি শেষ নেই? অপমৃত্যুর মিছিল থামাতে এই প্রশ্নের উত্তর আজ জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রতিবছর লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটছে। শত শত মানুষের মৃত্যুর খবর আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে। স্বজন হারানোর আহাজারিতে প্রতিনিয়ত ভারি হয়েছে উঠছে পরিবেশ। নৌপরিবহন অধিদফতরের তথ্যমতে, দেশে সবচেয়ে বেশি লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটে সংঘর্ষের কারণে। শুধু এ কারণে নৌপথে দুর্ঘটনার হার ৪২ দশমিক ৭০ শতাংশ। এছাড়া চালকের অদক্ষতা, অসতর্কতা, বেপরোয়া মনোভাব ও বৈরী আবহাওয়ার কারণেও নৌযানের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। আর নৌ দুর্ঘটনার অন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত যাত্রী বা মাল বোঝাই, বৈরী আবহাওয়া, অগ্নিকান্ড ও নৌযানের তলদেশ ফেটে যাওয়া। শুধুমাত্র সরকারি হিসেবেই ১৯৯১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত নৌ দুর্ঘটনার সংখ্যা ৫৭০টি। আর এসব নৌ দুর্ঘটনায় সরকারি হিসেবেই মারা গিয়েছেন ৩ হাজার ৬৫৪ জন। নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৪৮৯ জন। সরকারি এই পরিসংখ্যানের বাইরে বেসরকারি হিসেবে সংখ্যাটি আরও বাড়বে, তাতে সন্দেহ নেই। সাম্প্রতিক সময়েও বেশ কয়েকটি বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। ইতোপূর্বে নৌ মন্ত্রণালয়ের তরফে নদীতে লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পেছনে চিহ্নিত করা হয়েছিল নয়টি কারণ। সেসব কারণ চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা এড়াতে কমিটির পক্ষ থেকে বিশ দফা সুপারিশও করা হয়। প্রতিবার দুর্ঘটনার পেছনে যেসব কারণ বিদ্যমান, তা আমাদের সবারই জানা। দুর্ঘটনা এড়াতে আমাদের কি করতে হবে তাও জানা। তারপরও প্রতিবার নৌ দুর্ঘটনার পেছনে সেই কারণগুলোই কাজ করেছে। 
এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ, দুর্ঘটনায় অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হলেও, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কারো শাস্তি না হওয়া। লঞ্চ দুর্ঘটনা প্রতিরোধের আমাদের পর্যাপ্ত আইনের অভাবের কথা বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। ১৯৭৬ সালের একটি সরকারি অধ্যাদেশ পাঁচ দফায় সংশোধন করার পরেও এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান মাত্র ১০ হাজার টাকা জরিমানা। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল আইনের খসড়ায় চালক বা মালিকের গাফিলতিতে দুর্ঘটনায় জানমালের ক্ষতি হলে ১০ বছর সাজার একটি প্রস্তাব করা হলেও সেটি থেকে সম্প্রতি সরে এসেছে নৌপরিবহন অধিদফতর। সাম্প্রতিক সময়ে যে কয়েকটি দুর্ঘটনা, তার প্রায় প্রত্যেকটি সংঘর্ষ থেকে। সংঘর্ষের কারণে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে বিষয়টি গত কয়েকটি দুর্ঘটনায় আরও স্পষ্ট হয়েছে। আর এ ধরনের দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে চালকের অবহেলা ও অসাবধানতা। তাই আমরা মনে করি, লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রতিবছর অসংখ্য মানুষের অপমৃত্যু বন্ধ করতে প্রথমেই দোষীদের কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে। সেই সঙ্গে নৌযানগুলো যেন সঠিক নকশা অনুযায়ী নির্মাণ করা হয়, নিয়মিত নৌযানগুলোর ফিটনেস তদারকির ব্যবস্থা থাকে এবং সর্বোপরি নৌযানের চালক ও তাদের সহযোগীদের দক্ষতা-অভিজ্ঞতার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় নৌযান দুর্ঘটনা যেমন এড়ানো কঠিন হবে তেমনিভাবে প্রতিনিয়ত অসংখ্য সম্ভাবনাময় প্রাণের হারিয়ে যাওয়ার বেদনাও বাড়তে থাকবে। নৌ দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পেছনে আরও একটি কারণ ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন। এমনিতেই ঝড়বৃষ্টির মৌসুমে ছোট নৌযানের দুর্ঘটনায় পড়ার আশঙ্কা বেশি, তার ওপরে যদি সেসব নৌযানে অতিরিক্ত যাত্রীবহন করা হয়, তাহলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বাড়ে। তাই আমরা মনে করি ছোট আকারের নৌযানের সংখ্যা ও চলাচলের রুট সীমিত করে বড় আকারের নৌযানের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। সেইসঙ্গে নৌপথে যাত্রী পরিবহনের জন্য যেসব নিয়মকানুন রয়েছে নৌযানগুলোর সেসব নিয়ম কানুন যথাযথভাবে মেনে চলতে বাধ্য করার পাশাপাশি নৌ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে দক্ষতা, দায়িত্বশীলতা এবং জবাবদিহিতাও বাড়াতে হবে।