পহেলা মে 

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৮:০০ পিএম, ০২ মে ২০২১

পরিচিত পৃথিবীর বাইরে যেন ভিন্ন এক পৃথিবীতে পালিত হচ্ছে মে দিবস। আজ মহান মে দিবস। কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষের আজ সংহতি প্রকাশের দিন। আজ সম্পূর্ণ অচেনা এক মে দিবসের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে পৃথিবী জুড়ে যে গভীর সংকট তার থাবা মেলে, তা থেকে আমরা আজো মুক্ত হতে পারিনি। করোনা ভাইরাসের ছোবল থেকে আমাদের মুক্তি মেলেনি। সদাকর্মমুখর পৃথিবীর করোনার ভয়াবহ ছোবলে থমকে গিয়েছিল। লকডাউন নামের শব্দের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটিয়ে মানুষকে ঘরবন্দি করেছিল। বিপুল সংখ্যক মানুষ কাজ হারিয়েছিল। সেই ধারা থেকে আমরা আজো বেরিয়ে আসতে পারিনি। করোনার সংক্রমণের ঢেউ সে ধারার বাইরে আসার সুযোগ দেয়নি। মানুষকে স্বস্তির শ্বাস ফেলার সুযোগ দেয়নি। আজ এক কঠিন সময় পার করছে পৃথিবী। আমাদের দেশে করোনা তার দ্বিতীয় দফা ছোবল বসিয়েছে। মানুষ আজো অনেকটাই ঘরবন্দি। স্তব্ধ হয়ে আছে কল-কারখানা, শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বন্ধ হয়ে গেছে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কাজ হারিয়েছে অসংখ্য মানুষ। নতুন করে তারা কবে কাজ পাবে তা অনিশ্চিত।

এর মাঝেই আজ পালিত হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষের বিশেষ দিন। মে দিবস। একসময় শ্রমিকদের পরিশ্রম ছিল অমানুষিক। তাদের কাজের ধারাবাঁধা সময় ছিল না। শ্রমিকদের জোর করে দৈনিক আঠারো-বিশ ঘণ্টা কাজ করানো হতো। অথচ হাড়ভাঙ্গা শ্রম দিয়েও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হতো। শ্রমিকদের ওপর নানাভাবে  শোষণের ছড়ি চালানো হতো। দমবন্ধ করা পরিবেশে তাদের কাজ করতে হতো। এ থেকে পরিত্রাণ চাইছিল শ্রমিকরা। তারা মুক্তি চাইছিল তাদের ওপর চালানো এই অন্যায় থেকে। ফলে ঐক্যবদ্ধ হয় শ্রমিকরা। তারা শ্বাসরুদ্ধকর এবং অমানবিক অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে ঐক্যবদ্ধ হয়। শ্রমিকরা ১৮৮৬ সালের ১ মে সর্বাত্মক ধর্মঘট শুরু করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোসহ বড় বড় শহরে।  তারা দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ ও শ্রমের ন্যায্য মজুরির জন্য পথে নামে। অল্প সময়েই শ্রমিকদের আন্দোলন চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। শ্রমিক আন্দোলন থামাতে উদ্যোগী হয় পুলিশ।

শিকাগো শহরে শ্রমিক সমাবেশের ওপর গুলি চালানো হয়। পুলিশের চালানো সেদিনের গুলিতে নিহত হয় অনেকে, আহতও হয় অসংখ্য শ্রমিক। গ্রেফতার করা হয় অনেক শ্রমিককে। কয়েকজন শ্রমিককে দেওয়া হয় মৃত্যুদন্ড। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে সেদিনের সংগ্রামকে স্মরণীয় করে রাখতেই মে দিবস। ১৮৯০ সাল থেকে পালিত হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। মে দিবস পালিত হয় শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের প্রতীকী দিন হিসেবে। স্বাভাবিক সময়ে এদিন রাজপথে হাজার হাজার শ্রমিকের অংশগ্রহণের মাধ্যমে ফুটে ওঠে তাদের আপোষহীন পথ চলার কথা। আজকের দিন বিশ্বের সকল শ্রমজীবী মানুষের এক হওয়ার দিন। আজকের দিন শ্রমজীবী মানুষের ছুটির দিন। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট অনেক শ্রমিককেই দীর্ঘদিনের জন্য ছুটিতে পাঠিয়েছে। যা আমাদের কাম্য নয়। কোন শ্রমজীবী মানুষ কর্মবিহীন থাকুক তা কেউই চায়না। তবু করোনা মোকাবেলা করা বিশ্ব দেখছে অসংখ্য শ্রমিকের কর্মহীন সময়। আমাদের দেশেও করোনায় অসংখ্য শ্রমিক কর্মহীন হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বেতন পরিশোধের প্রক্রিয়া থমকে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের কাজের মজুরি অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে।

যা এই দুঃসময়ে শ্রমজীবী মানুষের জন্য নতুন সংকট তৈরি করেছে। শ্রমজীবী মানুষের অনেককেই আজ করোনা সংক্রমণ থেকে বাঁচার পাশাপাশি ক্ষুধার বিরুদ্ধেও লড়াই করতে হচ্ছে। কাজ বন্ধ থাকায় স্বাভাবিকভাবে উপার্জনও বন্ধ। শ্রমজীবী মানুষকে শঙ্কামুক্ত রাখতে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে সরকারের তরফ থেকে দশ তারিখের মধ্যে সকল শ্রমজীবীর মজুরি পরিশোধের কথা বলা হয়েছে। সরকারের তরফ থেকেও শ্রমজীবী মানুষকে সহায়তার জন্য নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির উদ্যোগও চলমান। আমরা প্রত্যাশা করি, সরকারের আন্তরিকতায় এই সংকট দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সক্ষম হবে। সংকটের কাল শেষ হবে, অন্ধকার কেটে আলো আসবে। সেই আলো আসবে শ্রমজীবী মানুষের হাত ধরেই। তাই শ্রমজীবী মানুষকে ভালো রাখতে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদেরও উদ্যোগী হতে হবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, শিল্প বিকাশের জন্যই শ্রমিকের অধিকার সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। মে দিবসে প্রার্থনা, করোনাকাল কাটিয়ে পৃথিবী আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠুক। মানুষ শ্বাস নিক মুক্ত বাতাসে। পৃথিবী আবার কর্মমুখর হয়ে উঠুক। মেহনতি মানুষের কর্মচাঞ্চল্যে পৃথিবী মুখরিত হোক।