সুদিন ফিরছে পাটে

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৮:২৩ পিএম, ২৪ আগষ্ট ২০২১

বিশ্বব্যাপী পাটের সোনালি সুদিন ফিরে আসছে। পাটপণ্যের জাগরণ শুরু হয়েছে নতুন করে। প্লাস্টিক ও সিনথেটিক পণ্য পরিবেশ বিধ্বংসী আগ্রাসন ঠেকাতে পাটের প্রতি মনোযোগী হয়ে উঠেছে বিশ্বের সচেতন মানুষ। ফলে দেশের এক সময়ের প্রধান অর্থকরী ফসল পাটের কদর বাড়ছে বিশ্বব্যাপী। আমাদের দেশেও এবার পাটের বাজার লাভজনক হয়ে উঠেছে। পাটে সয়লাব বাজার। ক্রেতা-বিক্রেতার আনাগোনায় জমজমাট বেচাকেনা। পাটের বাড়তি দাম। রমরমা হয়ে উঠেছে পাট বাণিজ্য। মৌসুমের শুরুতেই বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রতি পাটের দাম উঠেছে গড়ে দুই হাজার পাঁচশত টাকা থেকে তিন হাজার টাকা। পাটচাষিরা আশা করছেন, এবার পাটের মণ আরও বাড়তে পারে। গত বছর পাটের মৌসুম শেষে পাটের দাম সাত হাজার টাকায় উঠেছিল। পরপর দুই বছর পাটের ভাল দাম পাচ্ছেন কৃষক। দীর্ঘদিন পর আবার সোনালি আঁশে নতুন আশা দেখা দিয়েছে। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পর টানা দুই বছর ধরে কৃষক পর্যায়ে সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে পাট। এবার বাম্পার ফলন আর মৌসুমের শুরুতে ভাল দামে কৃষকের মুখে হাসি। পাটখাত ঘিরে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন দেশের প্রায় ১ কোটি চাষি। যত দিন যাচ্ছে দেশে পাটজাত পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেবল দেশে নয়-বিদেশেও এর কদর বাড়ছে। পাটের তৈরি নানা ধরনের ব্যাগ, পার্টস, জুতা, পুতুল, ম্যাট, শতরঞ্জি, শিকা, পাপোশ, সুতা, ল্যাম্পশেড, টুপি, চাবির রিং, মানিব্যাগ, ক্যালেন্ডার, কম্বল, পাট ও প্লাস্টিকের সমন্বয়ে তৈরি ফাইবার গ্লাসসহ বিভিন্ন গৃহস্থালি পণ্য তৈরি হচ্ছে। বিদেশে এসব রপ্তানি হচ্ছে। দু:খজনক বাস্তবতা হচ্ছে, সরকার পাটকল বন্ধ করে দিয়েছে।

পাটকল বন্ধ করায় পাটপণ্যের চাহিদা পূরণ ও রপ্তানির সুযোগ হাতছাড়া হলে, তা কর্মসংস্থান, শিল্প অর্থনীতি ও জাতির জন্য হবে মহা ক্ষতিকর। এটা সত্য, করোনাভাইরাস মহামারির ফলে সারাবিশ্বের অর্থনীতি সংকুচিত হয়ে পড়েছে। আমাদের দেশেও বিপুল সংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়েছে। এসএমই শিল্পে এক-তৃতীয়াংশ শ্রমিক কর্মহীন হয়েছে। নতুন কোন কলকারখানা হচ্ছে না। কর্মসংস্থানের কোন সুযোগ আর দেশে নেই। করোনার কারণে সারাবিশ্বে অনেক ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু করোনা বাংলাদেশের পাট শিল্পে তেমন ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারেনি। করোনা পরবর্তীকালে পাটজাত পণ্যের চাহিদা যে পরিমাণে বেড়েছে, তা উৎপাদন এবং সরবরাহের সক্ষমতা একমাত্র বাংলাদেশে রয়েছে। এটা আমাদের বিরাট এক সম্ভাবনার জায়গা ছিল। এমন সময় পাটকলগুলো বন্ধ করে দেওয়া জাতির জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। যাহোক, পাটজাত পণ্যের চাহিদার কারণে পাটের দাম এখনও লাভজনক। চলতি মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানভেদে প্রতি মণ পাট তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায় ওঠানামা করছে। বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) পাট কিনলে এবার পাটের দাম সাত হাজার টাকা পর্যন্ত উঠত বলে বলছেন পাটচাষিরা। রাষ্ট্রায়ত্ত ২৬টি পাটকলে উৎপাদন বন্ধ থাকায় বিজেএমসি এবার পাট কিনেনি। এ হিসেবে পাটের দাম বাড়তি থাকার কথা থাকলেও ঘটেছে উল্টো ঘটনা। দাম না কমে বরং বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেসরকারি পাটকল আর কাঁচা পাট রপ্তানিকারকরা এবার একচেটিয়া ব্যবসা করছেন। সম্প্রতি বিশ্বের কয়েকটি দেশে পরিবেশবান্ধব পাটের চাহিদা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও পাট পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। দামও রেকর্ড ছুঁয়েছে। করোনা মহামারির মধ্যেই পাট রপ্তানিতে নতুন রেকর্ড ছুঁয়েছে বাংলাদেশ। গত বছর পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে ১০৩ কোটি ৫৭ লাখ ডলার আয় হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, এবার সারাদেশে পাটচাষের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে সাত লাখ ৫৭ হাজার হেক্টর জমিতে ৯০ লাখ বেল পাট উৎপাদন। গত বছর সারাদেশে পাটের আবাদ হয় ৬ লাখ ৬৬ হাজার হেক্টর জমিতে। বিশ্বের মোট পাটের ৯০ শতাংশ উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে ও ভারতে।

এককভাবে বাংলাদেশ বিশ্বে উৎপাদিত কাঁচা পাটের ৪০ শতাংশ উৎপাদন করে। বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কাঁচা পাটের পাশাপাশি জুট ইয়ার্ন, টুওয়াইন, চট ও বস্তা রপ্তানি করে। এর পাশাপাশি রপ্তানি হয় হাতে তৈরি বিভিন্ন পাটজাত পণ্য ও কার্পেট। পাট চাষকে এদেশের চাষিদের কাছে লাভজনক ফসলে উন্নীত করতে হবে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য পাটের অসাধারণ ও গৌরবোজ্জল ভূমিকা আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। এ জন্য পাটকল চালু করার বিকল্প নেই। পরিবেশবান্ধব তন্তু পাটের ব্যবহার বাড়াতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচারণার ব্যবস্থাও নিতে হবে। পাট শিল্পের রপ্তানি আয়ের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে-এই বিষয়টি আমলে নিয়ে অগ্রগতির ধারা বজায় রাখতে হবে। স্মরণ করা যেতে পারে, দেশের এক সময়ের রপ্তানি আয়ের মূল ভরসা ছিল পাট। একে আবার স্ব-মহিমায় ফেরাতে যা যা করা দরকার সরকার তা করবে বলেই আমাদের প্রত্যাশা।