আগুনে পুড়ে আর কত মৃত্যু

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৮:০০ পিএম, ২৬ এপ্রিল ২০২১

পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় রাসায়নিকের গুদামের আগুনে পুড়ে মারা গেছে পাঁচজন। আহত কমপক্ষে আরও ৫০ জন। বাইশ এপ্রিল গভীর রাতে রাসায়নিকের গুদামে অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত।  আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে তিন ঘন্টা কাজ করে ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিট। সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়, আগুনলাগা ছয়তলা ভবনটির নিচতলার একদিকে ছিল রাসায়নিক পদার্থের ছোট ছোট দোকান, অন্যদিকে রাসায়নিক পদার্থের গুদাম। ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের বরাত দিয়ে সংবাদপত্রের প্রতিবেদন বলছে, গুদামে প্রচুর রাসায়নিক পদার্থ মজুদ ছিল। অগ্নিকান্ড ঘটা ভবনটির দ্বিতীয় তলায় একদিকে অফিস, অন্যদিকে দুটি ফ্ল্যাট আবাসিক বাসা। আর তৃতীয় থেকে ষষ্ঠতলা পর্যন্ত সব আবাসিক ফ্ল্যাট। রাসায়নিক দ্রব্যে আগুন লাগায় তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, দাউ দাউ আগুনের সঙ্গে রাসায়নিকের তীব্র ধোঁয়া ও ঝাঁজে ভেতরে আটকা পড়ে ভবনের বাসিন্দারা। ছাদে ওঠার সিঁড়ির দরজা বন্ধ থাকায় বাসিন্দারা ছাদেও যেতে পারেননি। সাহায্যের আশায় ভবনের বাসিন্দাদের চিৎকারে মানুষ এগিয়ে আসে সহায়তার জন্য। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা বিভিন্ন ফ্ল্যাটের বারান্দার গ্রিল ভেঙে আটকে পড়াদের উদ্ধার করে। পুরনো ঢাকায় এ ধরনের দুর্ঘটনা নতুন না। এর আগেও মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। অন্যান্য বারের মতো এবারও অগ্নিকান্ডের ঘটনায় তদন্ত কমিটি হয়েছে। যথাসময়ে হয়তো কমিটি তদন্ত প্রতিবেদনও দেবে।

 কিন্তু তাতে কি ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধ করা যাবে? থামানো যাবে এমন মর্মান্তিক মৃত্যু? আমরা তো ভুলে যাইনি ২০১০ সালে পুরনো ঢাকার নিমতলীতে রাসায়নিকের গুদামে লাগা আগুনে পুড়ে ১২৪ জন মানুষের মৃত্যুর কথা। আমাদের স্মৃতিকে এখনও দগ্ধ করে ২০১৯ সালে পুরান ঢাকারই চুড়িহাট্টার একটি রাসায়নিকের গুদামে লাগা আগুনে পুড়ে ৭০ জন মানুষের মারা যাবার ঘটনা। ভয়াবহ ও মর্মান্তিক এসব দুর্ঘটনার পর পুরান ঢাকা থেকে অবৈধ রাসায়নিকের গুদাম সরিয়ে নিতে সুপারিশ করে একাধিক তদন্ত কমিটি। কিন্তু সেই সুপারিশ আলোর মুখ যে দেখেনি তার প্রমাণ আরমানিটোলায় রাসায়নিকের গুদামে আগুন। কয়েক বছর আগের একটি পরিসংখ্যান বলছে, পুরান ঢাকায় রাসায়নিক গুদাম রয়েছে প্রায় ২৫ হাজার। এর মাঝে ১৫ হাজারের বেশি রয়েছে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে। রাসায়নিকের ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য অনুমতি আছে মাত্র আড়াই হাজারের মতো। বাকি সবই অবৈধ। ২০১১ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে পুরান ঢাকার রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আজও বাস্তবায়িত হয়নি। পুরান ঢাকায় রাসায়নিক কারখানায় বারবার আগুন লাগছে। প্রতিবারই আগুনে পুড়ে মারা যাচ্ছে অসংখ্য মানুষ।

 আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক কারখানার গুদাম থাকার কথা না। তারপরও বছরের পর বছর আবাসিক এলাকায়, আবাসিক ভবনে রাসায়নিক কারখানা, গুদাম রয়ে যাচ্ছে। যা হয়ে উঠেছে মৃত্যুকূপ। প্রতিবার আগুন লাগে, নির্মমভাবে মানুষের পুড়ে মারা যাবার খবর সংবাদমাধ্যমে আসে। আমরা সোচ্চার হই। সংবাদমাধ্যমে নানা ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ পায়। সবাই নড়েচড়ে বসে। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন হয় না। আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম ও রাসায়নিকের কারখানা সরে না। আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা সরিয়ে নেবার কথা অনেক বছর ধরেই আলোচনায়। তারপরও কেন তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না? আমরা মনে করি অতীতে অগ্নিকান্ডের ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটি যেসব সুপারিশ করেছে,তার দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। দ্রুত বিকল্প জায়গা প্রস্তুত করে রাসায়নিকের কারখানা ও গুদাম সরিয়ে নিতে হবে। সেইসঙ্গে যারা অবৈধভাবে আবাসিক এলাকায় রাসায়নিকের ব্যবসা পরিচালনা করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় বারবার এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম সরানোর বিকল্প নেই। অতীত ও বর্তমান দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেই আমরা প্রত্যাশা করি।