সুপেয় পানির সংকট 

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৬:১৪ পিএম, ২০ এপ্রিল ২০২১

পানির অপর নাম জীবন। খাবার পানি, রান্না, গোসল, সেচসহ সব কাজে ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ। সুপেয় ও চাষাবাদের পানির চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশই ব্যবহার হয় ভূ-গর্ভস্থ স্তর থেকে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের মানুষ সুপেয় পানির তীব্র সংকটে পড়েছেন। খবরের মাধ্যমে এমন বিষয়ও জানা যাচ্ছে, জলবায়ুর প্রভাবে উপকূলের মানুষকে আট থেকে দশ কিলোমিটার দূরে গিয়ে এক কলসি পানি কিনে আনতে হয়। উপকূলীয় এলাকায় এক কলসি পানির দাম পঞ্চাশ থেকে আশি টাকা। বিশুদ্ধ যাচাই-বাছাই তো দূরের কথা, কোনো মতে খাওয়া যায় এমন খাবার পানি যোগাড় করতে উপকূলের নারীদের দিন কেটে যায়। এক পরিসংখ্যান বলছে, সুপেয় পানি ও স্বাস্থ্য সম্মত পয়: নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে বিশ্বে প্রতিদিন পাঁচ বছরের কম বয়সি প্রায় ১ হাজার ৪০০ শিশুর মৃত্যু ঘটছে। অন্য পরিসংখ্যান বলছে, এ সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার হবে। তার মানে শিশুরা পানি সংকটের সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী।

 সুপেয় পানি প্রাপ্তির সুযোগ বর্তমানে বিশ্ব ব্যাপী মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। জাতিসংঘ পানি অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। নিরাপদ পানির অধিকার বঞ্চিত বিপুল জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই আবার চরম দরিদ্র। প্রান্তিক এ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ বাস করে গ্রামে। সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী নারী ও শিশুরা। এশিয়া ও আফ্রিকার সংকট ভয়াবহ। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ব্যবহারের ধরন পরিবর্তনজনিত কারণে পৃথিবীতে প্রতি বছর ১ শতাংশ হারে পানির ব্যবহার বাড়ছে। জাতিসংঘের হিসেবে বর্তমানে প্রায় ৪০০ কোটি মানুষকে বছরে কমপক্ষে এক মাস নিদারুণ পানির কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে। একজন মানুষের পান ও অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি পালনের জন্য প্রতিদিন ২০ থেকে ৫০ লিটার দূষণমুক্ত পানির প্রয়োজন হয়।

 বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী পৃথিবীতে প্রায় ২০০কোটি মানুষ দূষিত পানি পান করছে। আর তার ফলে পৃথিবীতে বছরে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ শুধু ডায়রিয়াতেই মারা যাচ্ছে। বিগত কয়েক দশকে স্বাদু পানিতে বসবাসকারী জীবন সংখ্যা ক্রমাগতভাবে হ্রাস পাচ্ছে। পৃথিবীতে মোট পানির পরিমাণ ১৪০ কোটি ঘন কিলোমিটার। তাত্ত্বিকভাবে তার মধ্যে ব্যবহারযোগ্য পানির পরিমাণ মাত্র ০.০০৩ শতাংশ অর্থাৎ ৪৫ হাজার ঘন কিলোমিটার। একজন মানুষের দৈনিক খাদ্য যোগান দিতে। মাঠ পর্যায়ে উৎপাদন থেকে শুরু করে খাবার টেবিল পর্যন্ত পৌছাতে) দুই থেকে পাঁচ হাজার লিটার স্বাদু পানির প্রয়োজন হয়। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেইন ডেভেলপমেন্ট তাদের এক প্রতিবেদনে সম্প্রতি জানিয়েছে, হিমালয় পর্বত অঞ্চল প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকায় ভূমিকা রাখে।

 এই অঞ্চল থেকে পাওয়া পানি ব্যবহৃত হয় খাদ্য ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে। নিশ্চিত হয় বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য। এ ছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং পানির উৎসগুলোর অতি ব্যবহার ঘটার ফলে বাসিন্দাদের ক্রমেই ঠেলে দিচ্ছে এক হতাশাজনক পরিস্থিতির দিকে এমনটিও জানা গেছে। আর যথাযথ পরিমাণে যথাযথভাবে পরিকল্পিত পানি সংগ্রহের ব্যবস্থা তৈরি করা না গেলে ভূ-গর্ভের পানির ওপর অত্যধিক নির্ভরতা ভবিষ্যতে আরো খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করার যে বিষয়টি সামনে আসছে-তাও আমলে নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপের অন্যতম। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভয়াবহ সেচের পানির সংকটেও পড়েছে বাংলাদেশ। এ বিষয়গুলো এড়ানো যাবে না। এই পরিস্থিতিতে সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলায় বৃষ্টির পানি ধরে রাখার কর্মসূচি বিস্তৃত করা, ভারী শিল্প ও কলকারখানায় ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে আনা সহ আমাদের স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা ও কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি। সামগ্রিক পরিস্থিতি আমলে নিয়ে সংকট নিরসনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে সংশ্লিষ্টরা তৎপর থাকবে এমনটি কাম্য।