এগোনোর পথে কৃষির অবদান

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ১২:০০ এএম, ০৯ এপ্রিল ২০২১

আমাদের অর্থনীতির একটি বড় চালিকা শক্তি কৃষি নির্ভর। আজ বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের প্রায় চৌদ্দভাগ আসে কৃষি থেকে। কৃষিতে কর্মসংস্থান হয়েছে শতকরা ৪১ ভাগ মানুষের। কৃষি আমাদের প্রায় আঠারো কোটি মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির নিশ্চয়তা বিধান করে না, বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের জোগানও দেয়। খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে অনন্য উদাহরণ। আজ বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ। আমাদের এই এগিয়ে যাবার পেছনে রয়েছে কৃষিক্ষেত্রে আমাদের সফলতা। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু কৃষির ওপর গুরুত্ব দিয়ে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন। আজ আমাদের এই এগিয়ে যাওয়ার পেছনে কাজ করেছে কৃষিকে গুরুত্ব দিয়ে সাজানো অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। যা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করছে বর্তমান সরকার। আমাদের এগিয়ে যাওয়া স্বস্তিদায়ক। কিন্তু এক্ষেত্রে অস্বস্তির খবরও রয়েছে। আমরা এখনও কৃষিপণ্যের নায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পারিনি। যা কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির জন্য সুখকর নয়। অথচ এই করোনা মহামারীকালে যখন পুরো বিশ্ব থমকে গিয়েছিল, যখন বিশ্বের উৎপাদন ব্যবস্থায় ধস নামে, তখন একমাত্রই কৃষিই সচল রেখেছে অর্থনীতির চাকা। আমাদের দেশেও করোনা সংক্রমণের কারণে যখন সবকিছু স্থবির, কৃষির চাকা ছিল তখনও সচল। চরম দুঃসময়ে কৃষিই আমাদের পথ দেখিয়েছে সম্ভাবনার। আমাদের স্বাধীনতার পর থেকে কৃষিই আমাদের অগ্রসরতার প্রতীক। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে যখন বিপর্যস্ত দেশ, তখনও ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়াবার শক্তি যুগিয়েছে কৃষি। অথচ ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে প্রতিনিয়ত কমে আসছে আমাদের কৃষি জমির পরিমাণ।

 কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ১৯৭১-৭২ সালে যেখানে আমাদের মাথাপিছু জমির পরিমাণ ছিল ২৮ শতাংশ, বর্তমানে তা কমে এসেছে মাত্র ১০ শতাংশে। কৃষি জমির এই শূন্যতা সত্ত্বেও আমাদের কৃষি মুখ থুবড়ে পড়েনি। বিপুল জনসংখ্যার দেশ হওয়ার পরও আমাদের খাদ্য সংকট দেখা দেয়নি। এর কারণ আমাদের কৃষি। কৃষির সফলতার কারণেই আজ আমরা ধান উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়, মাছ উৎপাদনে চতুর্থ, ইলিশ উৎপাদনে প্রথম, গরু-ছাগল উৎপাদনে দ্বিতীয়, মৌসুমি ফলের মধ্যে কাঁঠাল উৎপাদনে প্রথম, আম উৎপাদনে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম। শুধু তাই নয়, প্রতিয়িনত আমাদের কৃষকের হাত ধরে ধান, গম ও ভুট্টা উৎপাদনেও আমরা এগিয়ে চলেছি। এমনকি বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও দুর্যোগসহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবনেও আমরা এখন শীর্ষে। আমাদের ডাল, তেলজাতীয় শস্য, শাকসবজি ও ফলমূলের উৎপাদনও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যহারে। এক তথ্যে জানা যায়, ২০০৬ সালে যেখানে দেশে ২ কোটি ৬১ লাখ টন খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়েছিল, তা ২০১৯-২০ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ৪ কোটি ৫৩ লাখ ৪৩ হাজারে উন্নীত হয়।এই সফলতার পেছনে রয়েছে আমাদের কৃষকের সম্মিলিত শক্তি। তাই পেশা হিসেবে কৃষি যেন অর্থহীন না হয়ে পড়ে সেদিকেও নজর দিতে হবে। 

এজন্য কৃষককে আত্মনির্ভরশীল হবার সুযোগ দিতে হবে। কৃষক হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম ও অর্থ ব্যয়ে যে ফসল উৎপাদন করছে, তা যদি লাভ রেখে বিক্রি করতে না পারে,তাহলে সে কৃষিতে আগ্রহ হারাবে। কৃষককে তার উৎপাদিত ফসলের দাম পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে এবং এটাই হতে পারে কৃষককে আত্মনির্ভরশীল হবার যথার্থ পথ। অথচ দেখা যাচ্ছে কৃষক ফসল উৎপাদনের পর তার হাতে যখন ফসল থাকছে, সে দাম পাচ্ছে না। তার উৎপাদন খরচ উঠছে না। অন্যদিকে যখন কৃষকের হাত থেকে ফসল চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীর হাতে, তখন সেই ফসলের দাম বাড়ছে। যার কোনো অংশই কৃষকের কাছে আসছে না। কৃষক লাভবান হচ্ছে না। এতে করে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষক, তেমনিভাবে আমাদের কৃষিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ এই কৃষকের হাত ধরেই আজ আমরা খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশ। এই কৃষকের ঘাম ঝরানো ফসলের কল্যাণেই আজ আমরা খাদ্য ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। কৃষির এই সফলতা ধরে রাখতে আমাদের নজর দিতে হবে। কৃষকের প্রাপ্য নিশ্চিত করার মাধ্যমে সর্বোচ্চ উৎপাদনের ধারা বজায় রাখার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি সুষ্ঠু বাজারজাতকরণের মাধ্যমে কৃষকের ন্যায্য পাওনা মেটানোর মধ্য দিয়ে আমাদের দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।