ভাসানচরে বিদেশি কূটনীতিকবৃন্দ

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৬:২৫ এএম, ০৭ এপ্রিল ২০২১

রোহিঙ্গা ইস্যু বাংলাদেশের জন্য বড় সমস্যা। দীর্ঘদিন ধরে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আমাদের ঘাড়ে চেপে আছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে এই বিপুল জনগোষ্ঠী দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। মানবিক কারণে বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়। কিন্তু বিপুল এই জনগোষ্ঠীর বোঝা দীর্ঘদিন বহন করা যে কোন দেশের পক্ষেই অসম্ভব। এছাড়া এই বিপুল জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন আমাদের ভূখন্ডে অবস্থানের কারণে নষ্ট হচ্ছে সামাজিক ভারসাম্য। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা ঠাঁই নেয় কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ে। বর্তমানে রোহিঙ্গারা সাময়িকভাবে বাস করলেও প্রতিবছর তাদের ঘরে জন্ম নিচ্ছে হাজার হাজার শিশু। পালিয়ে আসা এই হতাশাগ্রস্ত মানুষরা দীর্ঘদিন একইস্থানে থাকায় তাদের অনেকেই নানাভাবে অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে এমন অভিযোগ বিস্তর। একইসঙ্গে এইসব মানুষের কারণে রোহিঙ্গাক্যাম্পের আশপাশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটছে। রোহিঙ্গারা নির্বিচারে গাছ ও পাহাড় কাটার মাধ্যমে পরিবেশেরও বিপুল ক্ষতিসাধন করছে। এ অবস্থায় সরকার জরুরিভাবে রোহিঙ্গাদের জন্য ভাসানচরের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিকল্পনা নেয়। দ্বীপটির উন্নয়নে সরকার বিনিয়োগ করে ৩৫০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। রোহিঙ্গাদের বসবাস উপযোগী করতে ১৩ হাজার একর আয়তনের ভাসানচর দ্বীপে ব্যবস্থা করা হয় মিঠা পানির, এছাড়া চমৎকার হ্রদ ও যথাযথ অবকাঠামো ও আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা হয়। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, কৃষি জমি, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, দুটি হাসপাতাল, চারটি কমিউনিটি ক্লিনিক, মসজিদ, গুদাম, টেলিযোগাযোগ পরিষেবা, থানা, বিনোদন ও শিক্ষা কেন্দ্র এবং খেলার মাঠও রয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পর সরকার ১ লাখ রোহিঙ্গাকে কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে স্থানান্তর করার পরিকল্পনা নেয় এবং সেখানে তাদের পুনর্বাসনের জন্য পাঠাতে শুরু করে।

 তবে রোহিঙ্গাদের এই স্থানান্তরের বিরোধীতা করে অনেকেই। জাতিসংঘের অনিচ্ছার পরও গত বছর ১৬৪২ রোহিঙ্গাকে নিয়ে ভাসানচরে স্থানান্তর শুরু করে সরকার। এ পর্যন্ত কয়েক দফায় কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছে। স্থানান্তরিত রোহিঙ্গাদের অবস্থা দেখতে ইতোপূর্বে জাতিসংঘের ১৭ জনের একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি ভাসানচর পরিদর্শন করে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি বাংলাদেশে কর্মরত ১০ দেশের কুটনৈতিক নোয়াখালীর হাতিয়ায় ভাসানচর পরিদর্শন করেন। ৩ এপ্রিল, শনিবার রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি দেখতে ভাসানচরে আসেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জার্মানি, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক, জাপান, নেদারল্যান্ড ও কানাডার মিশন প্রধানরা। কুটনৈতিকরা ভাসানচরে অবস্থান করে সেখানে বিভিন্ন বয়সের রোহিঙ্গাদের সঙ্গে তাদের সুযোগ-সুবিধা, জীবনযাত্রার মানসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করেন এবং ভাসানচরের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।

 জাতিসংঘ এবং বিদেশি কূটনীতিকদের ভাসানচর পরিদর্শনে আমরা প্রত্যাশা করি এদেশে অবস্থান করা রোহিঙ্গাদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে যে নজর তারা রেখেছেন, একই নজর তারা রোহিঙ্গাদের মাতৃভূমিতে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রেও রাখবেন। রোহিঙ্গা ইস্যু আজ শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, বিশ্বের জন্যও একটি বড় ইস্যু। একটি দেশের নাগরিকদের জোর করে নির্যাতনের মাধ্যমে অন্য দেশে ঠেলে পাঠানোর মতো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সকল রাষ্ট্রের সোচ্চার হওয়া জরুরি। একটি দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘদিন অন্যের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়াও অন্যায়। তাই ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য নির্মিত আবাসস্থল পরিদর্শনকারী কুটনৈতিকরা এবং ইতোপূর্বে জাতিসংঘের পরিদর্শকরা শুধু এখানে রোহিঙ্গাদের সুযোগ-সুবিধার দেখভালই নয়, রোহিঙ্গাদের দ্রুত তাদের দেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতেও উদ্যোগী হবেন বলে আমরা আশা করি। এই সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন জরুরি অথচ দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য বিদেশিরা এদেশে রোহিঙ্গাদের দেখভালের বিষয়ে যতোটা আন্তরিক তাদেরকে দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে সেই আন্তরিকতায় যথেষ্ট অভাব রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপই মিয়ানমারকে বাধ্য করতে পারে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে। এ বিষয়ে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি আমরা বিদেশি কূটনৈতিকদের প্রতিও রোহিঙ্গাদের মাতৃভূমিতে ফেরত পাঠানোর জন্য উদ্যোগ প্রত্যাশা করি।