বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীর গতিপথ পরিবর্তন

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৪, ২০২২, ০১:৩৫ দুপুর
আপডেট: নভেম্বর ২৪, ২০২২, ০১:৩৫ দুপুর
আমাদেরকে ফলো করুন

সারিয়াকান্দি বগুড়া সংবাদদাতা : বগুড়া সারিয়াকান্দি উপজেলার সীমানায় যমুনা নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। গতিপথ পরিবর্তনে এ উপজেলার কৃষিজমির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অপরদিকে নদীর নাব্যতা সংকটে নানাবিধ  ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী যমুনা নদীর অবস্থান ছিল বামতীর ঘেঁষে, পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে নদী ভাঙনের ফলে এর অবস্থান হয় ডানতীর ঘেঁষে, ডানতীরে নদী শাসনের কাজ হওয়ায় বর্তমানে নদী আবারও বামতীর ঘেঁষে অবস্থান করছে।

স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সারিয়াকান্দি উপজেলার যমুনা নদীর ডান তীরের সামনে চালুয়াবাড়ী, হাটশেরপুর, কাজলা এবং সারিয়াকান্দি সদর ইউনিয়নে বিশালাকার চরাভূমির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এইসব এলাকা দিয়ে বয়ে যাওয়া একসময়ের প্রখর স্রোতধারার প্রমত্তা যমুনা নদী এখন তার গতিপথ পরিবর্তন করে বাম তীর ঘেঁসে জামালপুরের সীমানার কাছাকাছি অবস্থান করছে। 

স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে যমুনা নদী বাম তীর ঘেঁসে তার অবস্থান ছিল। ফলে ডানতীর ঘেঁসে অনেক স্থায়ী জনপদের সৃষ্টি হয়েছিল। স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে এইসব এলাকাগুলোর পূর্ব দিকে যমুনা নদী বামতীর ঘেঁসে এর গতিপথ প্রমত্তা আকারে ছিল। ডানতীর সংলগ্ন কাজলা, হাটশেরপুর ইউনিয়নের জনপদে ছিল বিভিন্ন জমিদারদের বসবাস। জমিদার বামেজ তরফদার, জমিদার মধুরাম পালরা এখানে জমিদারি করেছেন। নীলকররাও এসব এলাকাগুলোতে তাদের কুঠি স্থাপন করেছিল। হাটবাজার, স্কুল-কলেজ এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে মুখরিত ছিল গ্রামগুলো।

১৯৫৮ সাল হতে প্রমত্তা যমুনায় নদী ভাঙন শুরু হয়। ১৯৭৭ সালের পর এই ভাঙন ভয়াবহ রুপ নেয়। ফলে বিভিন্ন সময়ে ডান তীরের ১০৫টির বেশি গ্রাম  নদী ভাঙনের শিকার হয়ে সম্পূর্ণভাবে যমুনাগর্ভে বিলিন হয়ে যায়। এগুলোর মধ্যে অন্তারপাড়া, ধরবন, মানুরপাড়া, সাহানবান্ধা, নিজতিত পরল, ধাপ, ময়ূরের চর, কাজলা, কুড়িপাড়া, বাওইটোনা, শালুখা, গজারিয়া, বাগবেড়, দেলুয়াবাড়ী, ধনতলা, নান্দিনার পাড়া, চন্দনবাইশা, বৈশাখী, রৌহাদহ, দড়িপাড়া, ইছামারা, গোদাখালি, দীঘাপাড়া, শেরপুর, শাকদহ, মথুরাপাড়া, চিলাপাড়া, কুমারপাড়া প্রভূতি গ্রামগুলো উল্লেখযোগ্য। ফলে এইসব অঞ্চলের ওপর দিয়ে যমুনা নদী তার প্রবল স্রোতধারা নিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। তখন নদীর গতিপথের অবস্থান হয় ডানতীর ঘেঁষে। 

১৯৭৭ সালে শুরু হয় নদী শাসনের কাজ।  ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের শাসনামলে সারিয়াকান্দির প্রধান পয়েন্টে কালিতলায় একটি গ্রোয়েনবাঁধ নির্মিত হয়। এরপর ১৯৯৬ সাল হতে শুরু করে ২০০০ সাল পর্যন্ত ৩৭ কোটি টাকা ব্যায়ে গ্রোয়েনবাঁধটির পুনঃনির্মাণ কাজ হয় এবং দৃষ্টিনন্দন করে গড়ে তোলা হয়। সর্বমোট ২২৫ কোটি টাকা ব্যায়ের এই প্রকল্পটির নামকরণ করা হয় ‘যমুনা এবং বাঙালি নদী একীভূতকরণ রোধ’। এই প্রকল্পের কাজ তদারকি করে ইংল্যান্ডের হ্যালকো কোম্পানি এবং নির্মাণ প্রতিষ্ঠান হলো কোরিয়ার হুন্দাই কম্পানি। প্রকল্পের আওতায় সদর ইউনিয়নের দীঘলকান্দি এবং কর্ণিবাড়ী ইউনিয়নের দেবডাঙায় দুইটি বড় হার্ডপয়েন্ট নির্মাণ করা হয়। নদী ভাঙনের কবল হতে রক্ষা পেতে  সারিয়াকান্দির হাটশেরপুর ইউনিয়নে হাসনাপাড়া বাজারের সামনে ১০১৫.৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫৫৮ মিটার স্পার নির্মাণ করা হয়েছিল ২০০২ সালে। এ ইউনিয়নের নিজবলাইল বাজারের সামনেও একইসাথে একই ধরনের আরও একটি স্পার নির্মাণ করা হয় একই বছরে। এছাড়া ধনুট সীমানা হতে সারিয়াকান্দির হাটশেরপুর ইউনিয়নের হাসনাপাড়া বাজার পর্যন্ত  প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা ব্যায়ে ২০০৮ সাল হতে ২০১৮ সাল পর্যন্ত যমুনা নদীর ডানতীর সংরক্ষণের কাজ করা হয়। এরমধ্যে ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০৬ সালে কালিতলা গ্রোয়েনবাঁধ হতে পারতিতপরল পর্যন্ত ২০০০ মিটার এবং দেবডাঙা পয়েন্টে ১২০০ মিটার তীর সংরক্ষণ কাজ হয়েছে। ২০০৬ সালের পর পারতিত পরল হতে হাসনাপাড়া পর্যন্ত তীর সংরক্ষণ কাজ হয়। এছাড়া ২০১৬ সালে রৌহাদহ হতে মথুরাপাড়া পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ কাজ হয় ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে। ফলে উজান থেকে বয়ে আসা পলিজমে উপজেলার চালুয়াবাড়ী, হাটশেরপুর, কাজলা, কর্নিবাড়ী  এবং সারিয়াকান্দি সদরের মৌজায় বিশালাকার আয়তনের চরাভূমির সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের মতে নদীশাসনের কাজগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য যমুনা নদী তার গতিপথ পরিবর্তন করে এখন বামতীর ঘেঁষে জামালপুরের সিমানার কাছাকাছি অবস্থান করছে।     

বর্তমানে যেখানে যমুনা নদীর মূল স্রোতধারা বয়ে চলেছে সেখান হতে সারিয়াকান্দি হাটশেরপুর ইউনিয়নের বলাইল বন্যা নিয়ন্ত্রণ স্পারের আনুমানিক দূরত্ব ১০ কিলোমিটার এবং হাসনাপাড়া স্পারের দূরত্ব ৫ কিঃ মিঃ। সদর ইউনিয়নের কালিতলা গ্রোয়েনবাঁধ হতে বর্তমান স্রোতধারার নদীর দূরত্ব প্রায় ৮ কিলোমিটার এবং দীঘলকান্দি হার্ডপয়েন্ট হতে দূরত্ব ১১ কিলোমিটার। কর্ণিবাড়ী ইউনিয়নের দেবডাঙা হার্ডপয়েন্ট হতে দূরত্ব ৭ কিলোমিটার।

যমুনা নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে উপজেলার চারটি ইউনিয়নের মৌজার জমিগুলো পুনরায় জেগে উঠেছে। এসব জমিগুলোতে নানা ধরনের কৃষি ফসল উৎপাদিত হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে এসব অঞ্চলগুলো হতে নদী ভাঙনের শিকার হয়ে অন্যত্র চলে যাওয়া জনসাধারণ আবার পুনরায় নতুন করে এখানে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখছেন।

নদীর গতিপথ পরিবর্তনের জন্য নানা ধরনের জনদুর্ভোগেরও সৃষ্টি হয়েছে। নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে উপজেলার হাটশেরপুর ইউনিয়নের হাসনাপাড়া, নিজবলাইল, শাহানবান্ধা এবং সদর ইউনিয়নের পারতিতপরলের সামনের নৌঘাট শুকনা মৌসুমে বন্ধ থাকছে। এছাড়া নাব্যতা সংকটের কারণে উপজেলার একমাত্র জনবহুল কালিতলা নৌঘাট ৫ কিলোমিটার দূরে কর্ণিবাড়ী ইউনিয়নের দেবডাঙায় স্থানান্তর করতে হয়। ঘাটটি দিয়ে যমুনার পূর্বের জেলাগুলোর সাথে পশ্চিমের জেলাগুলোর সংযোগ স্থাপন হয়। ফলে এই নৌঘাটে যাতায়াত করা হাজারো পথচারী সীমাহীন কষ্টে নদী পারাপার করেন। সারিয়াকান্দির বিভিন্ন ধরনের কৃষিফসলের ৭০ ভাগ যমুনার চরাঞ্চলগুলোতে উৎপাদিত হয়। নদীর নাব্যতা না থাকায় এসব ফসলগুলো ঘোড়ার গাড়ি বা গরুর গাড়িতে করে পরিবহণ করতে হচ্ছে বেশি ভাড়া দিয়ে। ফলে কৃষিফসলের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। নদীতে পানি না থাকার কারণে যমুনার ডানতীরের অঞ্চলগুলোতে পানির লেয়ার নিচে নেমে যায়। তখন এসব এলাকার বসবাসরত জনপদের মানুষরা তাদের টিউবওয়েলে পানি কম পান। লেয়ার নিচে নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপে বা শ্যালো মেশিনগুলোও পানি সংকটে পড়ে।

সারিয়াকান্দি সদর ইউনিয়নের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আরমান আলী জানান, ১৯৫৯ সালে নদীভাঙনের শিকার হয়ে তিনি কাজলার কুড়িপাড়া হতে এখন সদর ইউনিয়নের পারতিতপরল গ্রামে স্থায়ী বসতি গড়ে তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘হামাগিরে আগের সেই ভিটেমাটি জাগে উঠছে। কিন্তু আগের সেই দিনগুলে আর ফিরে পামু না। আগের সেই হাসিগানে মুখরিত বাপ দাদার ভিটেমাটি এখন শুধুই ধূধূ বালুচর।’

সারিয়াকান্দি সদর ইউনিয়নের বাসিন্দা নূরুল হোসেন বলেন, ‘হামাগিরে বাপ দাদার ভিটেমাটি আবারও জাগে উটছে। সেটি হামরা একন মেলা ফসল ফলাচ্চি। তবে ফসলগুলে বাড়িত নিয়ে আসতে মেলা ট্যাকা ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া দেওয়া নাগে।’ 

সারিয়াকান্দি সোনাতলা আসনের সংসদ সদস্য সাহাদারা মান্নান বলেন, প্রয়াত এমপি আব্দুল মান্নানের প্রচেষ্টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময়ে সারিয়াকান্দিতে বিভিন্ন হার্ডপয়েন্ট, স্পার এবং নদীতীর সংরক্ষণের কাজ করেছেন। ফলে এর সামনে পলিমাটি পরে বিশালাকার চরাভূমির সৃষ্টি হয়েছে এবং যমুনা নদী তার গতিপথ পরিবর্তন করেছে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়