কৃষিতে ব্যাপকহারে ব্যবহার হচ্ছে কীটনাশক : হুমকিতে জনস্বাস্থ্য

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৪, ২০২২, ১২:৫৬ দুপুর
আপডেট: নভেম্বর ২৪, ২০২২, ১২:৫৬ দুপুর
আমাদেরকে ফলো করুন

শাওন রহমান : শস্যের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কৃষিতে ব্যাপকহারে ব্যবহার হচ্ছে কীটনাশক। কীটনাশকের ব্যবহারে মানা হচ্ছে না কোন নিয়মনীতি। এর যথেচ্ছা ব্যবহারে জনস্বাস্থ্য যেমন হুমকিতে পড়ছে তেমনি নষ্ট হচ্ছে মাটির উর্বরতা শক্তি। বছরে কেবল কৃষি জমিতেই ব্যবহার করা হচ্ছে ৪০ হাজার টন কীটনাশক, যার বড় একটি অংশ কোন না কোনভাবে যাচ্ছে মানবদেহে। এতে মানুষ যেমন নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, তেমনি মারা যাচ্ছে সাপ, ব্যাঙ ও পাখিসহ নানা ধরনের উপকারী কীটপতঙ্গ ও প্রাণি।

প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিপিএ) তথ্য মতে, গত এক বছরের ব্যবধানে দেশে কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ, পরিমাণে যা সাড়ে পাঁচ হাজার টন। কৃষি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ক্রপ প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশন (বিসিপিএ) সূত্রে জানা গেছে, দেশে গত আট বছরে মোট ৪ লাখ ২২ হাজার ৬৬৬ টন বালাইনাশক ব্যবহার হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বগুড়া কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মোট আবাদি জমির পরিমাণ ২ লাখ ২৪ হাজার ১১ হেক্টর। এরমধ্যে এক ফসলী জমি রয়েছে ৯ হাজার ৭শ’ হেক্টর, দুই ফসলী জমি  এক লাখ ১১ হাজার ২শ’ হেক্টর, তিন ফসলী জমি এক লাখ ৯১১ হেক্টর এবং চার ফসলী জমির পরিমাণ দুই হাজার ৬শ’ হেক্টর। চলতি মৌসুমে বগুড়ায় প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে ৩ লাখ সাড়ে ১০ হাজার  মেট্রিকটন সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ ফসলের খেতে প্রাথমিকভাবে জৈব সার, ফেরোমোন বড়ি এবং হাত ও আলোর ফাঁদ দিয়ে পোকা দমনসহ যান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে আসছে। এতে কাজ না হলে পরিমিত পরিমাণ কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শও দেওয়া হয়। কৃষকদের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) ও সমন্বিত শস্য ব্যবস্থাপনা (আইসিএম) ক্লাব আছে। এসব ক্লাবে কৃষকদের সার ও কীটনাশক ব্যবহারের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপরও অনেক কৃষক দ্রুত ও বেশি ফলনের জন্য খেতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করেন। 

বগুড়া সদরের শ্যামবাড়িয়া এলাকার কৃষক আব্দুল খালেক বলেন, এক যুগ আগেও সবজি খেতে দুই সপ্তাহে একবার কীটনাশক ছিটালেই হতো। বর্তমানে পোকা আর রোগবালাইয়ের আক্রমণ বেড়েছে। দু’দিন পরপর জমিতে কীটনাশক স্প্রে করতে হয়। কীটনাশক ছিটানোর পরপরই কোন কোন জমি থেকে সবজি তুলে বাজারে নিতে হয়।

আরেক কৃষক শাহিনূর রহমান বলেন, এবারের আমন চাষে তিন থেকে চার বার পর্যন্ত কীটনাশক স্প্রে করতে হয়েছে। রাসায়নিক স্প্রে না করলে প্রত্যাশিত ফসল পাওয়া যায় না। তিনি আরও বলেন, আগের চেয়ে ফসল উৎপাদনে খরচ বেড়েছে, ফলে জমি থেকে কাঙ্খিত ফলন না তুলতে না পারলে ব্যর্থ পরিশ্রমের সাথে লোকসানও গুণতে হয়। 

চাষি টুকু সরকার বলেন, বর্তমান সময়ে জমিতে যে ফসলই করি সপ্তাহে দু’বার কীটনাশক স্প্রে করতেই হয়। ২২ শতক জমিতে বেগুন চাষ করে সপ্তাহে দু’বার কীটনাশক দিয়েও পোকা দমন করা যাচ্ছে না, এখন মনে হচ্ছে একদিন পরপর কীটনাশক স্প্রে করতে হবে। 

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) একটি গবেষণায় বগুড়ায় উৎপাদিত কিছু টাটকা সবজিতে অতিমাত্রায় কীটনাশকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। 

জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বগুড়ার উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা ফরিদুর রহমান বলেন, বগুড়ার কৃষকেরা সবজিখেতে অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করেন এটা যেমন ঠিক তেমনি কীটনাশক ব্যবহার কমাতে কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। মূলত বেশিরভাগ কৃষক দ্রুত ও বেশি ফসল পাওয়ার আশায় কীটনাশক ব্যবহারে ঝুঁকছেন। তিনি আরও বলেন, ফসলে কীটনাশকের বিকল্প হিসেবে জৈব কীটনাশক এবং কীটপতঙ্গ দমনের প্রাকৃতিক পদ্ধতি ব্যবহার নিশ্চিত করতে কৃষকদের নানাভাবে সচেতন করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফসলের উৎপাদন বাড়াতে কীটনাশকের ব্যবহারের প্রয়োজন আছে, তবে তা নিয়ম মেনে এবং মাত্রার মধ্য থেকে ব্যবহার করা দরকার। কিন্তু আমাদের দেশে কীটনাশক ব্যবহারের কোনো নিয়ম মানা হয় না।

চিকিৎসকরা বলছেন, কীটনাশক ছিটানোর পরপরই খেত থেকে সবজি তুলে বিক্রি করলে তা খেয়ে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ ছাড়া কীটনাশক দেওয়া সবজি খেয়ে কিডনি, যকৃতের জটিলতাসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ে। 

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়