‘বাল্যবিয়ে এবং দারিদ্র্যতাই মূল কারণ’

বগুড়ায় ৩ বছরে মাধ্যমিকে ঝরে পড়েছে ৫২ হাজার ৮৬৬জন শিক্ষার্থী

প্রকাশিত: আগস্ট ০৮, ২০২২, ০৮:৫২ রাত
আপডেট: আগস্ট ০৮, ২০২২, ০৮:৫২ রাত
আমাদেরকে ফলো করুন

নাসিমা সুলতানা ছুটু: বগুড়ার শেরপুর উপজেলার পেঁচুল উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী রাফিয়া (ছদ্ম নাম) কয়েকদিন আগে বিয়ে হয়েছে। গত দুই বছরে রাফিয়ার মত ওই বিদ্যালয়ের প্রায় চল্লিশের বেশি শিক্ষার্থীর বাল্যবিয়ে হয়েছে। বাল্যবিয়ে ছাড়াও বগুড়ায় মাধ্যমিক শ্রেণিতে ঝরে পড়া থামছে না। তবে ছেলে শিক্ষার্থীর তুলনায় মেয়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার বেশি। স্কুলের তুলনায় মাদ্রাসা পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার আরও বেশি। বাল্যবিয়ে, দারিদ্র্যতা ও অসচেতনতাই এজন্য দায়ী বলে জানিয়েছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।

বগুড়া জেলা শিক্ষা বিভাগের তথ্যানুয়ায়ী ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিন বছরে জেলায় ৫২ হাজার ৮৬৬জন শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। এরমধ্যে স্কুল পর্যায়ে ঝরে পড়েছে ৩৩ হাজার ৬০৭জন শিক্ষার্থী এবং মাদ্রাসা পর্যায়ে ঝরে পড়েছে ১৯ হাজার ২৫৯জন।  স্কুল পর্যায়ে তিন বছরে ঝরে পড়ার গড় হার প্রায় ৬ শতাংশ। অপরদিকে মাদ্রাসা পর্যায়ে  ঝরে পড়ার গড় হার ৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। তবে স্কুল ও মাদ্রাসা উভয় ক্ষেত্রেই নারী শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে বেশি। স্কুল পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে ১৯ হাজার ৮৬৯জন এবং পুরুষ শিক্ষার্থী ১৩ হাজার ৭৩৮জন। অপরদিকে মাদ্রাসায় নারী শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে ১০ হাজার ২২৫জন এবং পুরুষ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে ৯ হাজার ৩৪জন।

জেলা শিক্ষা বিভাগের হিসেব অনুযায়ী গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ঝরে ২০২১ সালে। ওই বছর স্কুল পর্যায়ে ঝরে পড়েছে ১১ হাজার ৮৫৯জন। ঝরে পড়ার হার ৫ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং মাদ্রাসা পর্যায়ে ওই বছর ঝরে পড়েছে ৬ হাজার ৫৮১জন। ঝরে পড়ার হার ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ। হারের দিক থেকে সবচেয়ে কম ঝরে পড়েছে ২০২০ সালে। ওই বছর স্কুল পর্যায়ে ঝরে পড়েছে ১১ হাজার ৩৩৫জন শিক্ষার্থী এবং মাদ্রাসা পর্যায়ে ঝরে পড়েছে ৬ হাজার ১৩১জন। স্কুল পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার ৫ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং মাদ্রাসা পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার ৮ দশমিক ১২ শতাংশ। অপরদিকে ২০১৯ সালে স্কুল পর্যায়ে ঝরে পড়েছে ১০ হাজার ৪১৩জন শিক্ষার্থী এবং মাদ্রাসা পর্যায়ে ঝরে পড়েছে ৬ হাজার ৫৪৭ শিক্ষার্থী। ওই বছর স্কুল পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং মাদ্রাসা পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ।

উপজেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে শেরপুর উপজেলায়। তিন বছরে ওই উপজেলায় ঝরে পড়েছে ১৩ হাজার হাজার ৩২৬জন। এরমধ্যে স্কুল পর্যায়ে ঝরে পড়েছে ৭ হাজার ৬৬৫জন এবং মাদ্রাসা পর্যায়ে ৫ হাজার ৬৬১জন। স্কুল পর্যায়ে সবচেয়ে কম ঝরে পড়েছে দুপচাঁচিয়া উপজেলায়। ওই উপজেলায় তিন বছরে ঝরে পড়েছে ১ হাজার ৪২৩জন।

শেরপুর উপজেলার পেঁচুল উচ্চ বিদ্যালয়ে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে গত দুই বছরে ৪০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থীর বাল্য বিয়ে হয়েছে বলে জানান ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ মোফাখ্খরুল আলম। তিনি বলে, ‘লকডাউনকালে বাল্য বিয়ের যে স্রোত সৃষ্টি হয়েছিল তা এখনও থামছে না। এসব বাল্যবিয়ের জন্য বাবা-মা’ একাই দায়ী নন, সামাজিক অবক্ষয়ও কিছুটা দায়ী। ছেলে-মেয়ে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে যে বাবা-মা সামাজিক কারণে অল্প বয়সী ছেলে মেয়েকে বিয়ে দিতে বাধ্য হন। অনেক সময় আমরা জানতে পেরে বাধা দিয়ে এসেছি, এতেও কোন লাভ হয়নি’। শেরপুর উপজেলা শিক্ষা অফিসার নজমুল ইসলাম জানান, ওই উপজেলায় বেশি শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ সামাজিক অবক্ষয় ও অসচেতনতার কারণে বাল্য বিয়ে, দারিদ্রতা ও কর্মহীনতা। মেয়ে শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে বাল্যবিয়েই বেশি দায়ী আর ছেলে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে দারিদ্র্যতা। করোনা পরবর্তী সময়ে অনেকে শিক্ষার্থীর বাবা বা পরিবারের উপার্জনশীল ব্যক্তি বেকার হয়ে পড়েছেন। সেক্ষেত্রে সন্তানকে তারা স্কুলে না পাঠিয়ে কোন কর্মে লাগিয়ে দিয়েছেন। 

বগুড়া জেলা শিক্ষা অফিসার মোঃ হযরত আলী জানান, করোনার কারণে দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ছিল। এ কারণে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক উভয়ের মধ্যে এক ধরণের হতাশা কাজ করেছে। করোনা যেমন শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবিমূখ করেছে, তেমন তাদের অভিভাবকরাও ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলেছেন। আবার কোন কোন শিক্ষার্থীর পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি করোনা ও লাকডাউনের কারণে বেকার হয়ে পড়েছেন। তখন তিনি তার মেয়ে সন্তান থাকলে কোর রকমে বিয়ে দিয়েছেন এবং ছেলে সন্তান থাকলে হয়তো কোথাও কাজে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া অসচেতনতার কারণে বাল্যবিয়ে তো রয়েছেই। শিক্ষার্থী যেন ভবিষ্যতে না ঝরে পড়ে এজন্য কোন উদ্যোগ আছে কী না, জানতে চাইলে এই শিক্ষা অফিসার বলেন, অবশ্যই আমরা উদ্যোগ নিচ্ছি। গ্রাম পর্যায়ের প্রতিটি স্কুল ও মাদ্রসায় গিয়ে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের নিয়ে সচেতনতা মূলক আলোচনা করা হবে। আরও অধিক সংখ্যক নারী শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির ব্যবস্থা করার জন্য সরকার চেষ্টা করছে পাশাপাশি ছেলে শিক্ষার্থীদেরও উপবৃত্তির আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়