ভুল তথ্যে ফেঁসে যাচ্ছেন পুলিশ কর্মকর্তারাও বগুড়ায় বেপরোয়া পুলিশের ‘সোর্স’

প্রকাশিত: আগস্ট ০৮, ২০২২, ০৮:৩২ রাত
আপডেট: আগস্ট ০৮, ২০২২, ০৮:৩২ রাত
আমাদেরকে ফলো করুন

মাসুদুর রহমান রানা: বগুড়ায় ভয়ংকর হয়ে উঠেছে পুলিশের ‘সোর্স’। ‘সোর্স’ নামধারি পুলিশের এই ‘ইনফরমার’দের দৌরাত্মে মানুষ অতিষ্ট। শহরতো বটেই, গ্রামেও সক্রিয় সোর্সরা। শহরে মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, অবৈধ ব্যবসা, ভেজাল ব্যবসা, আসামাজিক কার্যকলাপসহ সব ধরণের অপরাধ নিয়ন্ত্রন করে থাকে এই সোর্সরা। সেইসাথে মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি অথবা গাঁজা বা ইয়াবা পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে মানুষজনদের ফাঁসিয়ে দেয়ার মূল নায়কও তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বগুড়া জেলার ১২টি থানা ও ফাঁড়িতে রয়েছে পুলিশের ‘সোর্স’। সম্প্রতি বগুড়ায় একাধিক ঘটনায় সোর্সদের অপরাধ কর্মকান্ডও জনসম্মুখে প্রকাশিত হয়েছে। এক শ্রেণির হলুদ সাংবাদিকও পুলিশের সোর্স হিসাবে কাজ করে ফায়দা লুটছে। তবে সোর্সদের ভূয়া তথ্যে পুলিশ সদস্যরাও ফেঁসে যাচ্ছেন। তেমনী সাধারন মানুষও বিপদে পড়ছেন।

উল্লেখ্য, গত শুক্রবার শহরের নাটাইপাড়ায় নাপিতপাড়ায় টাকা চাঁদাবাজি করতে গিয়ে জনরোষে পড়েন সদর থানার এস আই মাসুদ রানা ও ইকবাল নামে পুলিশের এক সোর্স। বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে থানা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স সেখানে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে।

নাটাইপাড়ার কার্তিক চন্দ্র শীলের ছেলে তরুণ কুমার শীল অভিযোগ করেন, শুক্রবার বেলা দেড়টার দিকে তিনজন অপরিচিত লোক তার বাড়িতে প্রবেশ করে। এ সময় তাদের মধ্যে একজন সদর থানার এস আই মাসুদ রানা এবং অপর দু’জন ইকবাল ও ইমরান পরিচয় দিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। তারা পকেট থেকে গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য বের করে তাকে ফাঁসিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়া শুরু করে। সেইসাথে তারা তার বাসায় তল্লাশির নামে আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। এরপর এস আই মাসুদ রানা ও তার অপর সোর্স ইকবাল তার বাড়িতেই অবস্থান নেয়। তবে আরেক সোর্স ইমরান চলে যায়। এক পর্যায়ে তারা তাকে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে বাড়ি হতে টেনে হেঁচড়ে বের করে আনার চেষ্টা করলে তার ছোট ভাই তাদের বাধা দেয়। তখন এস আই মাসুদ রানা তাকেও মারধোর করে এবং তার মোবাইল ফোন ভাঙ্চুর করে। কিন্তু পরে বিষয়টি  জানতে পেরে  জনতা পুলিশকে অবরুদ্ধ করে রাখে। এরপর থানা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স এসে এস আই মাসুদ রানা ও সোর্স ইকবালকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। উল্লেখ্য, মোবাইল ফোনে অনলাইনে জুয়া খেলার ভুল তথ্য পেয়ে তারা সেখানে অভিযানে গিয়েছিল।

এ দিকে, বেশ কিছুদিন আগেও সদরের চাঁদমুহা এলাকায় চাঁদাবাজি করতে গিয়ে জনতা ২ জন সোর্সকে আটক করে এবং এক পুলিশ কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে আনে। এ ঘটনায় সে সময় ওই কর্মকর্তাকে সাসপেন্ড করা হয়।

অপরাধীদের সম্পর্কে নিয়মিত তথ্যদাতারা পুলিশের 'সোর্স' বলে পরিচিত। নাম-পরিচয় গোপন রেখে সম্ভাব্য ও সংঘটিত অপরাধ এবং অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে তারা। পরে তা পুলিশকে সরবরাহ করে। এ জন্য তাদের নিয়মিত আর্থিক সহায়তা (সোর্স মানি) দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে এলাকার দাগি সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীরাও নিজেদের স্বার্থে পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করে। পুলিশ ও সন্ত্রাসী উভয়ের সাথেই সখ্যতা থাকে সোর্সদের। যে কারণে সাধারণ মানুষ তাদের নিয়ে থাকেন আতঙ্কে। এক শ্রেণীর অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা সোর্সদের মাধ্যমেই নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে কথিত 'আটক বাণিজ্যে'র নামে অর্থ হাতিয়ে নেয়। 

সাধারণত অপরাধী সনাক্ত ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট কাজেই সোর্সের সহযোগিতা নিয়ে থাকে পুলিশ। তবে বেশ কিছু ঘটনায় পেশাগত কাজের বাইরে সোর্সদের সহযোগিতায় ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের ঘটনায় ফেঁসে গেছেন একাধিক পুলিশ কর্মকর্তাও। শুধু বগুড়া সদর থানার এস আই মাসুদ রানাই নন, সোর্সদের ভুল তথ্যের কারনে সম্প্রতি সদর থানার আরও তিন পুলিশ কর্মকর্তাও ফেঁসে গেছেন। তাদের অন্যত্র শাস্তিমূলক বদলী করা হয়েছে।

স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, সোর্সদেরকে দিয়ে এক শ্রেণির অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা উপরি উপার্জনের ধান্দা করে। সাধারণ মানুষকে দাঁড় করিয়ে রেখে তাদের পকেটে ইয়াবা বা মাদক দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে সোর্সরা। এরপর মামলার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয় তারা। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারে সাধারণত পুলিশের সোর্স প্রয়োজন হয়। এজন্য পুলিশের নিয়মিত বাজেটের একটা বড় অংশ সোর্সমানি হিসেবে বরাদ্দ রয়েছে। তবে কয়েকজন সোর্সের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এ সোর্সমানির টাকা সোর্সদের তেমন দেওয়া হয় না। তারা এলাকায় পুলিশের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা করেই তাদের পাওনা পুষিয়ে নেয়। আর এ কারণে সোর্সরা কখনো ওই টাকা দাবিও করে না। কখনও কখনও  সোর্স মানি হিসাবে উদ্ধার করা মাদকেরই কিছু অংশ তাদের দেয়া হয়। পরে তারা ওই মাদক মাদক কারবারিদের কাছেই বিক্রি করে পরিশ্রমের টাকা তুলে নেয়।

এ প্রসঙ্গে বগুড়া সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও পুলিশের মিডিয়া মুখপাত্র মো: শরাফত ইসলাম বলেন, সোর্সদের বিরুদ্ধে প্রায়ই অভিযোগ শোনা যায়। তাদের বিরুদ্ধে ব্ল্যাকমেইলিং থেকে শুরু করে নানা ধরনের অপরাধের অভিযোগ পাওয়া যায়। তবে সুনির্দিষ্টভাবে কারও বিরুদ্ধে  কোন অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি অবশ্যই দেখা হয়। তিনি বলেন, সোর্স সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। পুলিশ সদস্যদের সোর্সের দেয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করে দেখতে হবে। অন্যথায় সোর্সের ভুল তথ্যের কারণে ফেঁসে যেতে হবে। তিনি আরও বলেন, কোন পুলিশ কর্মকর্তা সাদা পোশাকে অভিযানে যাওয়ার নিয়ম নেই। অবশ্যই পুলিশের ইউনিফর্ম পড়ে অভিযানে যেতে হবে। তিনি বলেন, গত শুক্রবার সদর থানার এস আই মাসুদ রানা সাদা পোশাকে সোর্সকে নিয়ে নাটাইপাড়া নাপিতপাড়ায় অভিযান গিয়েছিলেন। বিষয়টি তাকেসহ সদর থানার ওসিকেও জানানো হয়নি। সোর্স তাকে ভুর তথ্য দিয়েছিল। এ কারনে এস আই মাসুদ রানাকে পুলিশ লাইন্স এ ক্লোজড করা হয়েছে। এ ঘটনায় সোর্স ইকবালকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, সোর্সদের মাধ্যমে কেউ কোন হয়রানির শিকার হলে সঙ্গে সঙ্গে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের জানাতে হবে। কাউকে পুলিশের নাম ব্যবহার করে কোন প্রকার অপকর্ম করতে দেয়া হবে না। তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়