পথিকদের জন্য অপেক্ষায় মুসাফিরখানা

প্রকাশিত: আগস্ট ০২, ২০২২, ০৩:০৪ দুপুর
আপডেট: আগস্ট ০২, ২০২২, ০৩:০৪ দুপুর
আমাদেরকে ফলো করুন

পোরশা (নওগাঁ) প্রতিনিধি : দেড় শতবছর পূর্বের কথা। উঁচু-নিচু বরেন্দ্র ভুমি। বন-জঙ্গলে ঘেরা। যখন হেঁটে চলতো পথিক মেঠোপথে। চলতে চলতে দুপুর হয়, দুপুর গড়িয়ে সন্ধা নামে। পথে যখন বাঘ- বিচ্ছুর ভয়, চোর-ডাকাতের উপদ্রব। মানুষ আশ্রয়ের সন্ধানে লোকালয় খোঁজে। কারও ভাগ্যে নিরাপদ আশ্রয় মেলে, আবার কারও ভাগ্যে মেলে ভোগান্তি। 

মানুষের এমন ভোগান্তি আর কষ্টের কথা চিন্তা করে এখন থেকে ১১৪বছর পূর্বে তৎকালীন এখানকার জমিদার খাদেম মোহাম্মদ শাহ তৈরি করেছিলেন একটি মাটির ঘর। তিনি ঘরের নাম দিয়েছিলেন মুসাফিরখানা। যেন বাইরের মানুষ বিপদে আপদে এই ঘরে এসে আশ্রয় পান। পথিকের রাত বা দিনে আশ্রয় এবং বিশ্রামের জন্যই এটি নির্মান করেছিলেন তিনি।

পথিকদের রাত এবং দিনে থাকার পাশাপাশি খাবারেরও ব্যবস্থা করেছিলেন জমিদার খাদেম মোহাম্মদ শাহ। থাকা এবং খাওয়া সবগুলিই একেবারেই বিনামূল্যে। পরিচালনা এবং সকল ধরনের খরচ চালানোর জন্য তিনি মুসাফিরখানায় দান করে দিয়েছিলেন ৮০বিঘা জমি। দানকৃত ঐ ৮০ বিঘা জমির আয় ও ৮টি ঘরের ভাড়ার টাকা দিয়ে মুসাফিরখানার সকল খরচ বহন করা হচ্ছে। 

উন্নত রাস্তাঘাট ও যোগাযোগ এবং দ্রুতগামী যানবাহনের এ যুগেও টিকে রয়েছে নওগাঁ জেলার পোরশা উপজেলার পোরশা সদরের মুসাফিরখানাটি। দূর-দূরান্তের পথিকদের আগের মতোই স্বাগত জানায় এ মুসাফিরখানাটি।

জেলা শহর নওগাঁ থেকে ৬৫ কিলোমিটার পশ্চিমে এবং বিভাগীয় শহর রাজশাহী থেকে ১শ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে কোনে পোরশা উপজেলা। পোরশা উপজেলা পরিষদের সদর দপ্তর পোরশা সদর থেকে ৫কিলোমিটার পশ্চিমে নিতপুর নামক স্থানে। আর মুসাফিরখানাটি পোরশার সদরের মিনা বাজারে অবস্থিত। 

বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যাক্তিদের নিকট থেকে জানা যায়, প্রায় ১৫০০ সালের পরে কোন এক সময়ে তৎকালীন বাদশা আলমঙ্গীরের আমলে ইরান থেকে হিজরত করতে বাংলাদেশের বরিশালে আসেন কয়েকজন শাহ বংশের মুরব্বী। এদের মধ্যে ফাজেল শাহ, দ্বীন মোহাম্মদ শাহ, ভাদু শাহ, মুহিদ শাহ, জন মোহাম্মদ শাহ, খান মোহাম্মদ শাহ অন্যতম। পরবর্তীতে বরিশাল থেকে তারা আসেন বর্তমান পোরশা সদরে। যদিও তখন এখানে কোন বসতবাড়ি ছিলনা। ছিল শুধু বোন-জঙ্গল।

এলাকাটি ভালো লাগায় তারা এখানে ঘর বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করতে শুরু করেন। এদের মধ্যে কয়েকজনের সাথে স্ত্রী-সন্তানও ছিলেন। পরবর্তীতে তাদের সন্তানের তাদের পরিবারের ছেলে মেয়েদের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে বংশ বিস্তার করান। এরপর থেকেই এ প্রথাটি আর্থাৎ নিজেদের বংশের মধ্যে ছেলে মেয়েদের বিয়ে দেয়ার প্রথাটি বর্তমানেও চালু রয়েছে পোরশায়।

এখানে বসবাস করার পর থেকে এ এলাকার প্রচুর জমি জমা পেয়ে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম এখানে জমিদারি করেন। এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্ম বর্তমানেও এখানে রয়েছেন। তাদেরই বংশধর খাদেম মোহাম্মদ শাহ্ যিনি এই মুসাফিরখানাটি নির্মান করেছিলেন।

পোরশা সদরের মিনা বাজারের বড় মসজিদের নিকটেই মুসাফিরখানা। রাস্তার সাথে লাগানো পূর্ব-পশ্চিম লম্বা দোতলা ভবন। ভিতরে প্রবেশের আগেই রয়েছে গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা। আবাসিক রুম রয়েছে ১৬টি, অফিস রুম ১টি, সেমিনার রুম ১টি, রয়েছে ১টি করে রান্নাঘর ও খড়িঘর। নিচতলায় রাস্তা সংলগ্ন রয়েছে ৮টি দোকান ঘর। দোকান ঘরগুলো ভাড়া দেওয়া রয়েছে। এখানে একসাথে ৬০জন মানুষ থাকতে পারবেন। থাকার সাথে খাবারও ফ্রী দেওয়া হয়। 

মুসাফিরখানা পরিচালনার জন্য কর্মচারী রয়েছেন ১জন ও ম্যানেজার রয়েছেন ১জন। তারােই মুসাফিরখানার সকল বিষয়ে খোঁজ খবর নেন এবং দেখাশোনা করেন। মুসাফিরখানার ম্যানেজার সিরাজুল ইসলাম জানান, তিনি এখানে প্রায় ২৭বছর যাবৎ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। প্রতিদিন কম-বেশি এখানে মানুষ থাকে। আর তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। আর প্রায় ৬০জন মানুষকে একসাথে এখানে রাখার মত ব্যবস্থা রয়েছে বলেও তিনি জানান।

পরিচালনা কমিটির সভাপতি জামিল শাহ্ জানান, ১৯০৮সালে এটি প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ ৮০ বছর মাটির ঘরেই এর কার্যক্রম পরিচালনা হয়েছে। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে মুসাফিরখানার জমিজমার আয় দিয়ে বর্তমান ভবনটি নির্মান করা হয়েছিল।

প্রতিদিন কম-বেশি এখানে মানুষ থাকে। তাদের খাবারের ব্যবস্থা করতে হয়। অনান্য দিনের তুলনায় রমজান মাসে এখানে মানুষের ব্যাপক ভিড় হয় বলে তিনি জানান। 

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়