কুড়িগ্রামে দেড়শতাধিক গ্রাহকের দুই কোটি টাকা নিয়ে উধাও

প্রকাশিত: মে ১০, ২০২২, ০৯:৫৮ রাত
আপডেট: মে ১০, ২০২২, ০৯:৫৮ রাত
আমাদেরকে ফলো করুন

কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি: কুড়িগ্রাম শহরের বিকিরণ কমার্স এন্ড বিজনেস লিমিটেড নামে একটি ভুঁইফোড় কোম্পানির বাহারি প্রচারণা আর হালাল মুনাফা পাওয়ার আশায় আকৃষ্ট হয়ে সর্বশান্ত হয়েছেন দেড়শতাধিক গ্রাহক। গ্রাহকের আমানতের প্রায় ২ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়েছে কোম্পানিটি। অফিসে সাইনবোর্ড থাকলেও ঝুলছে তালা। নেই কোন কার্যক্রম। প্রতিনিয়ত গ্রাহকরা টাকা নিতে এসে ফিরে যাচ্ছে।


কুড়িগ্রামে ২০১৩ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ভুক্ত জয়েন্ট স্টক কোম্পানির নিবন্ধন নিয়ে যাত্রা শুরু করে বিকিরণ কমার্স এন্ড বিসনেস লিমিটেড নামে এই কোম্পানি। শরীয়াভিত্তিক মুদারাবা পদ্ধতিতে ব্যবসা পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ৬টি আমানত প্রকল্পে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ শুরু করে। ডকুমেন্ট হিসেবে দেয়া হয় ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তিপত্র। স্থানীয় আলেম ও ব্যবসায়ীদের শরীয়াহ্ বোর্ড ও উপদেষ্টা পরিষদ নাম ব্যবহার করে সুকৌশলে কার্যক্রম শুরু করে তারা। কয়েকটি ক্যাটাগরিতে আকর্ষণীয় মুনাফা দেয়ার কথা বলে দেড়শতাধিক গ্রাহকের প্রায় ২ কোটি টাকা টাকা সংগ্রহ করে কোম্পানিটি। কেউ কেউ বিভিন্ন মেয়াদি মুনাফাও পেতে শুরু করে। কিন্তু ২০২০ সালে করোনার অজুহাতে মুনাফা প্রদান বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর থেকে অফিসে সাইনবোর্ড ছাড়া নেই কোন কার্যক্রম। আমানতকারীরা বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কর্মকর্তাদের দেখা মিলছে না।


অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কুড়িগ্রাম গণপূর্ত বিভাগের সামনে 'বিকিরণ কমার্স এন্ড বিসনেস সেন্টার' নামে কোম্পানির একটি সাইনবোর্ড ঝুলছে। পাওয়া যাচ্ছে না প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মাওলানা হাফিজুর রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আদম আলীকে। পাওনাদারের চাপে মাওলানা হাফিজুর কুড়িগ্রাম শহরের ডাকবাংলা পাড়ায় ভাড়া বাসা ছেড়ে ভোগডাঙায় গ্রামের বাড়িতে ফিরে গেছেন। আর আদম আলী গা ঢাকা দিয়ে আছেন অজ্ঞাত স্থানে। তিনি গ্রাহকদের ফোনও ধরেন না। বিকিরণে আমানত জমা দিয়ে নি:শ্ব প্রায় দেড়শ' পরিবার। এদের কেউ চাকরি শেষে অবসরকালীন টাকা, কেউ ব্যাংক ঋণের টাকা, কেউ জমি বিক্রি বা হজে যাওয়ার জন্য টাকা জমা করেছিলেন। কিন্তু প্রতারকদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে এখন কান্না তাদের নিত্যসংগী।


কোম্পানির গ্রাহক সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী নুরুল্লাহ্ ফাজিল মাদ্রাসার সিনিয়র শিক্ষক হারুন অর রশিদ বলেন, 'শরিয়া মোতোবেক লভ্যাংশের কথা শুনে আমি ও আমার স্ত্রী ২০২১ সালে হজে যাওয়ার নিয়তে টাকা জমা দেই। কিন্তু মেয়াদ শেষে টাকা ফেরত পাচ্ছি না। রাজারহাটের বৈদ্যেরবাজারের শহিদুল ইসলাম জানান, তার নিজের দেড় লাখ টাকাসহ ভাইবোন মিলে ৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা মাসিক লভ্যাংশ দেয়ার শর্তে বিনিয়োগ করেছেন বিকিরণে। মুনাফাতো নেই, আসল টাকাও পাচ্ছি না। হরিশ্বরকালোয়ার বাসিন্দা বৃদ্ধ হাবিবুর রহমান বলেন, বিকিরণে আমার ৬ লাখ টাকা জমা আছে। এখন কোন টাকাই ফেরত পাচ্ছি না। আমার মতো দেড়শ' লোকের কাছ থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা নিয়েছেন কোম্পানির কর্মকর্তারা। আমানতকারীদের টাকা ভাগ বাটোয়ারা করে তারা জমি ও বাড়ির মালিক হয়েছে। আর গ্রাহকরা হয়েছে নি:স্ব।


বিকিরণের সাবেক মাঠ কর্মী মাহফুজার অভিযোগ করেন, ২০১৭ সালে তিনি বিকিরণে যোগদানের সময় নগদ ১৫ হাজার টাকা ও ব্যাংকের দু'টি চেকের পাতা জমা দেন। এক সময় বুঝতে পারেন তারা অবৈধ ব্যবসায় সহযোগিতা করছেন। তিনিসহ ৫ জন মাঠকর্মী চাকরি ছেড়ে দেন। এরপরই তাদের ওপর অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তোলেন হাফিজুর ও আদমের বিকিরণ। তার বিরুদ্ধে চেক ডিজঅনারের দুটি মামলা দেয়া হয়। যার একটির বাদি ভাড়াটে এক ব্যক্তি। যাকে তিনি কখনও চিনতেন না। একই অবস্থা চাকরি ছেড়ে দেয়া মাঠকর্মী আনোয়ার, আব্দুর রশিদইলিয়াস, ইউনুছেরও।


বিকিরণ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মাওলানা হাফিজুর রহমান জানান, তিনি এখন মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন। ১০ লাখ টাকা ভর্তুকি দিয়ে অনেক আগেই কোম্পানির দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। আমি কোম্পানির কোন দায়িত্ব নেই। তবে তিনি কোম্পানির স্বার্থে দাবি করেন, মাঠ পর্যায় থেকে টাকা উত্তোলন না হওয়ায় ও ব্যবসায় লোকসানের কারণে বর্তমানে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।


ব্যবস্থাপনা পরিচালক আদম আলী বলেন, ২০১৭ সালের বন্যা আর ২০২০ সালের করোনার শুরু থেকে ব্যবসায় লোকসান হয়। সেকারণে গ্রাাহকদের লভ্যাংশ দেয়া সম্ভব হয়নি। পাওনাদারের চাপে অফিস বন্ধ করে কয়েকমাস বাইরে ছিলাম। গ্রাহকদের কাছ থেকে সময় নিয়ে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়