সামাজিকতা রক্ষায় সোনার কথা ভুলে যেতে হচ্ছে মধ্যবিত্তদের

রেকর্ড দাম বেড়ে সোনার ভরি লাখ ছুঁতে চলেছে

প্রকাশিত: আগস্ট ১৬, ২০২২, ০৯:১০ রাত
আপডেট: আগস্ট ১৭, ২০২২, ১১:২০ দুপুর
আমাদেরকে ফলো করুন

হাফিজা বিনা: কথা ছিল ফাতেমার (ছদ্ম নাম) বিয়েতে পাঁচ ভরি সোনা দিয়ে গলার মালা, কানের দুল,  হাতের বালা ও একটা টাইরা বানিয়ে দেবেন বাবা ফজলুর রহমান। গত পরশুদিন দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেছে। সবই ঠিক আছে কিন্তু সোনা দেবার সময় বাবা ফজলুর রহমান মেয়ের বিয়ের জন্য করা ওয়াদা আর রাখতে পারছেন না। কারণ দেশের ইতিহাসে রেকর্ড পরিমান দাম বেড়ে এক ভরি সোনার দাম ৮৪ হাজার ৩৩১ টাকায় উঠেছে। তাই এতদিনের স্বপ্ন ভেঙ্গে সোনার পরিমান কমে  দুই ভরিতে নেমে এসেছে। এছাড়াও পাত্র পক্ষের সাথে একটা সমঝোতা করেছেন তারা একভরির একটা বালা দেবেন, তিনি দেবেন কানের দুল আর গলার একটা সাধারণ মালা। দফায় দফায় সোনার দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ার কারণে ফাতেমার বাবার মত অনেক বাবা অসহায় হয়ে পড়েছেন সামাজিকতা রক্ষায়।

সোনা নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগ হওয়ায় সম্পদ হিসেবে বিয়ের সময় সামাজিকতা রক্ষায় ধনীরা ছাড়াও নিম্ন আয়ের মানুষরাও বাধ্য হন স্বর্ণের দোকানে যেতে। সোনার দাম বৃদ্ধির ফলে সামাজিক রীতি রক্ষা করতে গিয়ে বড় ধরণের চাপে পড়ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোতে। অলংকার হিসেবে সোনার ব্যবহার কমতে কমতে বিয়ে, জন্মদিন বা অন্যকোন অনুষ্ঠানে প্রিয়জনদের সোনার গহনা উপহার দিতে ভুলে যাচ্ছে সাধারণ  মানুষ। যেটুকু কিনছেন তা অনেকটা বাধ্য হয়েই। দেশে যৌতুক নেয়া নিষিদ্ধ হলেও এখনও বিয়েতে মেয়েদের বাধ্যতামূলকভাবে সোনা দিয়ে 'সাজিয়ে' দিতে হয় কনে পক্ষের পরিবারকে। সেখানেই সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় আছেন  নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা। দাম বাড়ার কারণে এক দিকে লাভ হচ্ছে এ্যান্টিকের গহনা ব্যবসায়ীদের । আগে যারা সোনার দোকান চালাতেন তারা এখন বেশিরভাগই এ্যান্টিক ব্যবসায়ী।

গত রোববার বগুড়ার নিউমার্কেটের একটি ক্রোকারিজ দোকান থেকে ৪২ পিসের একসেট ডিনার সেট কিনলেন বগুড়ার সুত্রাপুরের গৃহিনী মনিরা পারভীন। বললেন, ইচ্ছে ছিল ভাগ্নি জামাইকে একটা আংটি দেব । বিভিন্ন দোকান ঘুরে ঘুরে শেষে এই ব্যবস্থা। অতিরিক্ত দাম বাড়ার কারণে উপহার হিসেবে এখন আর কেউ সোনা দিচ্ছেনা। এর বদলে ক্রোকারিজ সামগ্রী, শাড়ি নয়তো নগদ টাকাও উপহার দেন। ৫ হাজার টাকা উপহার দিলে অনেক বেশি মনে হয়। কিন্তু ১০ হাজার টাকায় এখন একটি ভাল আংটিও পাওয়া যায়না।

বগুড়া জুয়েলারি মালিক সমিতির সভাপতি মোঃ মতলেবুর রহমান রাতুল বলেন, সোনার দাম বাড়ার পেছনে ব্যবসায়ী বা সরকারের কোন হাত নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের দাম বাড়ার জন্য সোনার দাম বেড়েছে। কমলে বাংলাদেশেও কমানো হবে। তিনি জানান, সর্বশেষ গত ৪ আগস্ট ভরিপ্রতি ১ হাজার ৪৯ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার গহনা কিনতে লাগছে ৮৪ হাজার ৩৩১ টাকা। ২১ ক্যারেট সোনার ভরি ৮০ হাজার ৪৮২ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৬৮ হাজার ৯৯৩ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির সোনার ভরির দাম ৬৬ হাজার ৯৭৯ টাকা। রেকর্ড পরিমান দাম বাড়ার পর বগুড়া শহরের বিভিন্ন মার্কেটের সোনার দোকানে ক্রেতাদের ভিড় খুবই কম দেখা গেছে। তবে ক্রেতাদের কথা মাথায় রেখে দেশের স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতি ( বাজুস)  সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বর্ণালঙ্কার কেনার পর তা ফেরত দিলে এখন থেকে ক্রেতারা ৮৫ শতাংশ অর্থ ফেরত পাবেন। আর স্বর্ণালঙ্কার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ৯২ শতাংশ অর্থ পাবেন ক্রেতারা। কিছু দিনের মধ্যে বগুড়াতেও এই বিষয়টি কার্যকরের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত  নেয়া হবে বলে জানান এই ব্যবসায়ী নেতা।

সোনার গহনা পরা এদেশের মানুষের প্রাচীন ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু বর্তমানে দাম বাড়ার ফলে মানুষের সাধ আছে, সাধ্য নেই অবস্থা। অন্যদিকে অর্ডার কমে যাওয়ায় অনেক স্বর্ণকার পেশা ছেড়ে দিয়ে এ্যান্টিকের ব্যবসা করছেন। স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা জানান আগে যেসব দোকানে প্রতিদিন ৮ থেকে ১২টা অর্ডার পাওয়া যেত সেখানে এখন দুই একটাও কোন কোন দিন হয়না।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়