অংশীজনের অভিযোগ-পরামর্শ আমলে নেয় না রেলওয়ে

প্রকাশিত: আগস্ট ০১, ২০২২, ১১:৫৯ দুপুর
আপডেট: আগস্ট ০১, ২০২২, ১১:২৫ রাত
আমাদেরকে ফলো করুন

ট্রেনে নিয়মিত যাতায়াত করেন ও ট্রেনের সেবার মান নিয়ে অভিযোগ-পরামর্শ দেন এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান নিয়ে অংশীজন তালিকা রয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের। ট্রেনে যাত্রীসেবার মান বাড়াতে এই অংশীজনদের নিয়ে প্রতি চার মাস অন্তর সভা করা হয়। সভা অনুষ্ঠিত হয় একেক সময়, একেক রেলস্টেশন বা জেলায়।

তবে রেলওয়ের এই অংশীজন সভা যাত্রী কল্যাণে তেমন কোনো অবদান রাখছে বলে মনে করেন না অংশীজনরা। তাদের অভিযোগ, প্রতিটি সভায় ঘুরেফিরে ট্রেনের টিকিট কাটতে সার্ভারে জটিলতা, রেলে পাথর নিক্ষেপ, ব্যাগ ছিনতাই, বিনা টিকিটে ভ্রমণ, টিকিট কালোবাজারি, রেলের জায়গায় অবৈধ স্থাপনা, স্টেশনে বিদ্যুৎ-পানি সমস্যা, অপরিচ্ছন্ন প্ল্যাটফর্ম-বগি অপরিষ্কার, ওয়াগন স্বল্পতা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বে অবহেলাসহ নানান অভিযোগ তুলে ধরেন তারা।

সভায় অভিযোগগুলো শোনেন এবং তা সমাধানের আশ্বাস দেন রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। কিন্তু এসব সমস্যা কমার বদলে ক্রমেই বাড়ছে।

এমন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগে সম্প্রতি ৬ দফা দাবি নিয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে টানা ১৯ দিন অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মহিউদ্দিন রনি। এই আন্দোলনে সমর্থন দেন দেশের সব স্তরের মানুষ। এ নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। অবশেষে ২৫ জুলাই রাতে রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশ্বাসে কর্মসূচি স্থগিত করেন রনি। ওই বৈঠকে রনিকে রেলের অংশীজনের তালিকায় রাখার সিদ্ধান্ত নেয় রেলওয়ে।

রেলওয়ের তালিকায় থাকা তিনজন অংশীজন অভিযোগ করেছেন, অধিকাংশ অংশীজন রেলওয়ে আয়োজিত সভায় অংশ নেন না। তার একটি বড় কারণ হলো, তারা রেলওয়েকে যেসব অভিযোগ ও পরামর্শ দেন, তার বাস্তবায়ন হয় না। ফলে দিন যত যাচ্ছে, রেলের অব্যবস্থাপনা ক্রমেই বাড়ছে। এছাড়া যারা অংশীজন সভায় অংশ নেন, তাদের যাতায়াত খরচও রেলওয়ে দেয় না। এতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন অংশীজনরা। এখন মহিউদ্দিন রনি যে ৬ দফা দাবি জানিয়েছেন, সেগুলো পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করতে রেলওয়ের কয়েক যুগ লেগে যাবে। রনিও একদিন অংশীজন সভায় অংশগ্রহণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।

তবে বাংলাদেশ রেলওয়ের সংশ্লিষ্টদের দাবি, তারা অংশীজনদের দাবি আমলে নিচ্ছেন। যখন যে অভিযোগ বা পরামর্শ আসে তা সাদরে গ্রহণ করা হয়। ভবিষ্যতে অংশীজনদের অভিযোগ-পরামর্শ আরও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

রেলওয়ের প্রশাসনিক বিভাগ সূত্র জানায়, প্রতি চার বা তিন মাস পরপর দেশের সব সংস্থা এবং প্রতিষ্ঠানে একবার করে অংশীজন সভা করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা রয়েছে। সে অনুযায়ী প্রতি চার মাস পরপর এই সভার আয়োজন করে রেলওয়ে। সবশেষ গত ৭ জুন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় নারায়ণগঞ্জ এলাকার অংশীজনসহ রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এই সভায় রেলের নানান সমস্যা তুলে ধরেন অংশীজনরা। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জে রেল সভা বাড়ানোরও পরামর্শ নেন তারা। তখন তাদের অভিযোগ এবং পরামর্শ আমলে নেওয়ার আশ্বাস দেন রেলওয়ের সংশ্লিষ্টরা।

রেলওয়ের অংশীজনদের তালিকার প্রথম দিকে রয়েছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি নারায়ণগঞ্জের অংশীজন সভায় অংশ নেন। আলাপকালে মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, রেলওয়ে অবকাঠামো উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিচ্ছে। কিন্তু ছোট ছোট বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিচ্ছে না। যেমন- তারা এখনো নিজ ব্যবস্থাপনায় টিকিট বিক্রি এবং কালোবাজারি বন্ধ করতে পারছে না। ট্রেন ফ্ল্যাটফর্ম নোংরা। টয়লেটে সাবান, টিস্যু থাকে না। এগুলো নিয়েই যাত্রীদের ভোগান্তি বেশি হয়। প্রতিটি সভায় এ বিষয়গুলো উপস্থাপন করছি। কিন্তু রেল বেশিরভাগ অভিযোগ ও পরামর্শই আমলে নেয় না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, রেলওয়ের অংশীজন কতজন থাকবেন, তা নির্ধারিত নয়। রেলওয়ে বা মন্ত্রণালয় যখন যাকে ইচ্ছা এই তালিকায় রাখে, বাদ দেয়। তবে তালিকায় সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত এমন ব্যক্তিদের গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর মধ্যে নিরাপদ সড়ক চাই, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা), বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি, যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, নৌ-সড়ক-রেল পথ রক্ষা জাতীয় কমিটিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর বাইরে রেল গবেষক, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও রয়েছেন। এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মহিউদ্দিন রনিসহ রিফাত জাহান শাওন, কামরুন্নাহার মুন্নি নামে আরও তিনজন এই তালিকায় যোগ হবেন। তাদের অংশীজন করতে ফাইল তৈরির কাজ চলছে।

অংশীজনদের নিয়ে সভা করার কাজটি সমন্বয় করেন রেলওয়ের যুগ্ম সচিব আ স ম আশরাফুজ্জামান। তিনি বলেন, সাধারণত অংশীজন সভায় টিকিট কালোবাজারি, চোরাচালান, রেলের প্ল্যাটফর্ম অপরিচ্ছন্নের অভিযোগ বেশি আসে। এগুলো আমরা তাৎক্ষণিক সমাধান করার চেষ্টা করি। কিন্তু এ কাজটি নিয়মিত করা খুব কঠিন। তারপরও রেলওয়ে তা করে যাচ্ছে। অংশীজনদের গুরুত্ব দিচ্ছে।

রেলের অব্যবস্থাপনা নিয়ে টানা ১৯ দিন আন্দোলনের পর গত ২৫ জুলাই সন্ধ্যায় রেল মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মহিউদ্দিন রনি। বৈঠকে তিনি ৬ দফা দাবি তুলে ধরেন। বৈঠকে রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশ্বাসে তিনি আপাতত কর্মসূচি স্থগিত করেন। ওই বৈঠকেই রনিকে অংশীজনের তালিকায় রাখার সিদ্ধান্ত নেয় রেলওয়ে।

রনিকে অংশীজনের তালিকায় রাখার কাজ কতদূর এগিয়েছে, জানতে চাইলে রেলওয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাসুদ  জানান, তারা রনিসহ তিনজনের নাম অংশীজনের তালিকায় রাখতে ফাইল তৈরি করছেন। শিগগির এ ফাইল রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হবে। তারা অনুমোদন দিলে চিঠি দিয়ে তা রনিকে জানানো হবে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, দৈনিক করতোয়া এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়