অনাচার ও বৈষম্যের এই ক্রান্তিকালে বড্ড বেশি প্রয়োজন নজরুলকে
স্টাফ রিপোর্টার : ‘গাহি সাম্যের গান, যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান, যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-খ্রীষ্টান। ’১১ জ্যৈষ্ঠ বাঙালি সংস্কৃতির মুক্তির দূত, সাম্য ও মানবতার আজীবন কাণ্ডারি, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী।
১৮৯৯ সালের এই দিনে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলা সাহিত্যের এই মুকুটহীন সম্রাট। অন্যায়, শোষণ আর পরাধীনতার বিরুদ্ধে যার কলম গর্জে উঠেছিল আজন্ম ‘বিদ্রোহী’র বেশে, সেই চির-তারুণ্যের কবিকে বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছে পুরো জাতি।
এবারের নজরুল জন্মজয়ন্তীর মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘সাম্যবাদ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় নজরুল’। কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক এবং সুরকার। বাংলা সাহিত্যে তার আগমন ছিল এক ধূমকেতুর মতো। তিনি শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ে যেমন কলম ধরেছেন,তেমনই বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করেছেন রাগপ্রধান গান, গজল, কীর্তন এবং কালজয়ী শ্যামাসংগীতের সুরমূর্ছনায়।
তার রচিত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা কিংবা ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ গান আজও যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে যুগিয়ে চলে রণসাজ ও অদম্য প্রেরণা। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে শৃঙ্খল ভেঙে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়। কবির সাহিত্যকর্মের অন্যতম মূল সুরই ছিল মানবমুক্তি এবং সমাজ বিনির্মাণে নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা।
তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে দাঁড়িয়ে তিনি নারীদের বন্দিদশা থেকে মুক্তির গান গেয়েছিলেন। তার বিখ্যাত ‘নারী’ কবিতায় তিনি উচ্চারণ করেছিলেন ‘বিশ্বের যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’
এই অমোঘ বাণীর মাধ্যমে কবি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, সভ্যতার অগ্রগতি ও সৃষ্টিশীল কোনো কিছুই এককভাবে পুরুষের অর্জিত নয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজ বা রাষ্ট্রকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে হলে পুরুষের পাশাপাশি নারীর আত্মমর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা অপরিহার্য। নারীর ত্যাগ, মমতা ও অবদানকে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা দিয়ে আড়াল করার যে প্রবৃত্তি, তার বিরুদ্ধে কবি বারবার তার লেখনীর মাধ্যমে কুঠারাঘাত করেছেন।
আরও পড়ুনকোনো জাত-পাত, ধর্ম বা লিঙ্গভেদের বৈষম্য তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। অথচ আজ যখন আমরা কবির জন্মজয়ন্তী উদযাপন করছি, তখন আমাদের চারপাশের সমাজব্যবস্থার দিকে তাকালে এক চরম বৈপরীত্য ও হতাশার চিত্র ফুটে ওঠে। বর্তমান সমাজে ধনী-দরিদ্রের আকাশচুম্বী বৈষম্য, রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি, অর্থপাচার, ক্ষমতার দম্ভ এবং সাধারণ মানুষের ওপর নানা সামাজিক অনাচার নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুচ্ছ কারণে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা কিংবা নারীর প্রতি সহিংসতার যে নির্মম রূপ আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি, তা কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।
এই অবক্ষয়ের দিনে অবলীলাক্রমেই মনে প্রশ্ন জাগে আজ যদি কবি নজরুল বেঁচে থাকতেন, তবে এই সামাজিক অনাচার আর মানবিক মূল্যবোধের পতন দেখে কি তিনি চুপ করে থাকতেন? নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, আজকের এই অন্যায় আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে তার কলম আবারও কালবৈশাখী ঝড়ের মতো গর্জে উঠত। শোষক আর দুর্নীতিবাজদের মুখোশ টেনে খুলে দিতে তিনি আবারও লিখতেন নতুন কোনো ‘বিদ্রোহী’ কিংবা ‘রক্তাম্বর ধারিণী মা’।
আজকের এই ক্রান্তিকালে আমাদের সমাজে নজরুলের মতো একজন সাহসী ও আপসহীন কণ্ঠস্বরের বড্ড বেশি প্রয়োজন। ক্ষমতার লোভ বা ভয়ের কাছে মাথা নত না করে সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার যে অদম্য সাহস নজরুল আমাদের শিখিয়ে গেছেন, তার চর্চা আজ সমাজে প্রায় অনুপস্থিত। তাই শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে, বর্তমানের এই অনাচার ও বৈষম্য দূর করতে নজরুলের দ্রোহ ও সাম্যের দর্শনকে আমাদের বাস্তব জীবনে ধারণ করা জরুরি।
বর্তমান বিশ্বের চলমান অস্থিতিশীলতা, যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ সামাজিক বৈষম্যের এই চাদরে ঢাকা সময়ে নজরুলের সাম্যবাদী, অসাম্প্রদায়িক ও জেন্ডার সমতার এই প্রগতিশীল চেতনা সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক বলে মনে করছেন এ প্রজন্মের নজরুল গবেষকেরা। কবির এই কালজয়ী দর্শন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন চেতনাকে বুকে ধারণ করেই এক সর্বজনীন, মানবিক ও বৈষম্যহীন নতুন সমাজ গড়ার অঙ্গীকার করছে বাঙালি জাতি।
মন্তব্য করুন







