নীল অর্থনীতি ও মৎস্য খাতের ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশের সম্ভাবনার এক বিশাল দরজা খুলে রয়েছে বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে। ‘নীল অর্থনীতি’ অর্থাৎ সাগর ও সামুদ্রিক সম্পদনির্ভর টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন এখন শুধু গবেষণার বা আলোচনার বিষয় নয়; বরং দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপকল্পের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। বিশেষ করে মৎস্য খাত, যা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় নিশ্চিত করেছে, নীল অর্থনীতির যুগে এক নতুন সম্ভাবনা সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ এখন প্রায় ১১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক জলসীমার অধিকার পেয়েছে, যা একটি পূর্ণাঙ্গ মেরিন রিসোর্স ভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ট। বাংলাদেশে মোট প্রাণিজ প্রোটিনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে মাছ থেকে। এই খাত সরাসরি প্রায় ২০ লাখ মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করে, আর পরোক্ষভাবে এই সংখ্যা ৪০-৫০ লক্ষে দাঁড়ায়। একসময় নদীনির্ভর মাছ ছিল প্রধান উৎস; এখন চাষভিত্তিক উৎপাদন দেশকে বিশ্বে ৩য় অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু সমুদ্রভিত্তিক মাছ ধরা, বিশেষ করে গভীর সমুদ্রের সামুদ্রিক মাছ ও মূল্যবান প্রজাতি এখনও তুলনামূলকভাবে অনাবিষ্কৃত। বিশ্বব্যাপী মেরিন ফিশারিজের বাজার ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে, বিশেষ করে টুনা, স্কুইড, লবস্টার, সী বাস, গ্রুপার, ইয়েলোফিন প্রভৃতি প্রজাতির চাহিদা বহুগুণ বাড়ছে। বাংলাদেশ চাইলে এই বাজারে প্রতিযোগিতামূলকভাবে প্রবেশ করতে পারে।
নীল অর্থনীতির সঙ্গে মৎস্য খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গেলে কিছু সম্ভাবনা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক: বাংলাদেশের জাহাজ ও নৌ-প্রযুক্তি এখনও গভীর সমুদ্রের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। ফলে আমাদের এ খাত থেকে আহরণের হার মাত্র ২০-২৫%। উন্নত ট্রলার, সোনার প্রযুক্তি, জিপিএস ভিত্তিক ন্যাভিগেশন এবং দক্ষ নাবিক তৈরি করতে পারলে এই খাত বছরেই বহু গুণ এগিয়ে যেতে পারে। সামুদ্রিক খাঁচা-চাষ বা মেরিন কেজ কালচার বাংলাদেশে বড় আকারে শুরু হয়নি। অথচ মালদ্বীপ, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো এ খাতে বিপ্লব ঘটিয়ে কোটি কোটি ডলার আয় করছে। ম্যানগ্রোভ বন, সীগ্রাস বেড- এসবকে ব্যবহার করে নীল কার্বন ট্রেডিং ভবিষ্যতে বড় আয়ের উৎস হতে পারে। একই সঙ্গে, টেকসই মাছ ধরা, নিষিদ্ধ মৌসুমে কড়াকড়ি, বায়োডাইভার্সিটি রক্ষা; এসব নিশ্চিত করলেই উৎপাদন স্থায়িত্ব পাবে। কাঁচা মাছ রপ্তানির দিন শেষ। এখন প্রয়োজন ভ্যালু অ্যাডেড পণ্য, ফিশ ফিলেট, ক্যানড ফিশ, সী-ফুড মিক্স, সুরিমি পণ্য। বিদেশে এর চাহিদা এত বেশি যে, সামান্য বিনিয়োগেই বাংলাদেশ বছরে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় বাড়াতে পারে।
সম্ভাবনার চেয়ে বাস্তবতা কখনও কখনও কঠিন হয়। বাংলাদেশের নীল অর্থনীতি বাস্তবায়নের পথে যেসব বাধা রয়েছে: গভীর সমুদ্র মৎস্য আহরণে ব্যবহৃত প্রযুক্তি- রাডার, সোনার, ফিশ-ফাইন্ডার, ট্রলিং সিস্টেম এখনও যথেষ্ট আধুনিক নয়। মেরিন বায়োলজিস্ট, ওশানোগ্রাফার, মেরিন টেকনোলজিস্ট- এদের ঘাটতি রয়েছে। নীল অর্থনীতি টেকসইভাবে বাস্তবায়নের মূল ভিত্তি গবেষণা। অথচ এ খাতে সরকারি ও বেসরকারি গবেষণায় বরাদ্দ এখনও কম। ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, সাগরের তাপমাত্রা পরিবর্তন; এগুলো মাছের প্রজনন ও বসবাসের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। নিষিদ্ধ মৌসুমে মাছ ধরা, ছোট মাছ ধ্বংস, অপরিকল্পিত জাল ব্যবহার- এসব এরপরও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বাংলাদেশ যদি নীল অর্থনীতি থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা নিতে চায়, তাহলে কয়েকটি কৌশল জরুরি: বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ, আধুনিক ট্রলার ক্রয়ে ভর্তুকি গভীর সমুদ্র ন্যাভিগেশন প্রশিক্ষণ। নির্দিষ্ট এলাকায় সী-ফুড চাষের জন্য মেরিন ইকোনমিক জোন গড়ে তোলা যেতে পারে। সিঙ্গাপুর ও চীন এভাবে বিপুল আয়ের উৎস তৈরি করেছে। ইন্সটিটিউট অফ মেরিন রিসার্চ, মেরিন ইউনিভার্সিটি এবং বাংলাদেশ ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউটকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি। মাছের প্রজনন মৌসুমে জেলে সহায়তা বৃদ্ধি, অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরা রোধে কঠোর শাস্তি, সাগর-পরিবেশ রক্ষায় স্যাটেলাইট মনিটরিং। আধুনিক ফিশ প্রসেসিং প্ল্যান্ট, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা, বিশ্ববাজারে ব্র্যান্ডিং। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, নীল অর্থনীতি বাংলাদেশকে সামগ্রিক জিডিপিতে অতিরিক্ত ২-৩% অবদান দিতে পারে। শুধু মৎস্য খাত থেকেই বছরে ৫-৭ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় সম্ভব। ২০২৫-২০৩৫ দশকে বাংলাদেশের সমুদ্রভিত্তিক অর্থনৈতিক টার্নিং পয়েন্ট আসতে পারে; যদি প্রযুক্তি, গবেষণা, নীতি সহায়তা এবং জেলেদের জীবিকা ও নিরাপত্তার সঠিক সমন্বয় করা যায়।
বাংলাদেশের নীল অর্থনীতি এখ ন আর দূ:স্বপ্ন নয়, এটি একটি বাস্তব ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। আমাদের চারপাশের জলের এই বিশাল ভান্ডার- মাছ, খনিজ, জ্বালানি, বায়োডাইভার্সিটি সবকিছু মিলিয়ে নীল অর্থনীতি আগামী প্রজন্মের জন্য টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। মৎস্য খাত তার কেন্দ্রবিন্দু, কারণ এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জীবনধারার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। সঠিক পরিকল্পনা নিলে, বঙ্গোপসাগরের নীল জলই হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক বিস্ময়ের উৎস।
লেখক
আরিফুল ইসলাম রাফি
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ-
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
মন্তব্য করুন

নিউজ ডেস্ক






_medium_1764413059.jpg)

_medium_1764412236.jpg)