ডায়াবেটিসের নীরব বিস্তার: ঝুঁকিতে কোটি প্রাণ
প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততা যান্ত্রিক শহর ঢাকা কিংবা মফস্বলের অলস বিকেল আমাদের জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে এক নিঃশব্দ ঘাতক। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যার নাম ‘ডায়াবেটিস মেলিটাস’, আর সাধারণ মানুষের কাছে যা কেবলই ‘চিনির অসুখ’ হিসেবে পরিচিত। অথচ এই সহজ শব্দটির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর বৈশ্বিক মহামারী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বর্তমান বিশ্বে যে ক’টি অসংক্রামক রোগ জনস্বাস্থ্যকে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে, ডায়াবেটিস তার মধ্যে অন্যতম। একসময় ডায়াবেটিসকে ভাবা হতো কেবল প্রবীণ বা বয়স্কদের বার্ধক্যকালীন সঙ্গী কিন্তু সময়ের চাকা ঘুরে আজ তা থাবা বসিয়েছে আমাদের তারুণ্য ও কৈশোরেও।
বিশ্বের মোট ডায়াবেটিস রোগীর প্রায় ৬০% অংশই এশিয়া অঞ্চলের বাসিন্দা। সাম্প্রতিক দক্ষিণ এশীয় গবেষণাগুলোতে দেখা গেছে, টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এশীয় অঞ্চলের ৬০% থেকে ৮৫% মানুষেরই যকৃতে অতিরিক্ত চর্বি বা মেদ জমার রোগ থাকে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি এবং এর কারণে যকৃৎ শক্ত হয়ে যাওয়া বা যকৃৎ কর্কটরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। উদ্বেগের বিষয় হলো, আক্রান্তদের মধ্যে যারা চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাদেরও প্রায় ৮০% এর বেশি রোগীর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নেই।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ডায়াবেটিসের হার মারাত্মকভাবে ক্রমবর্ধমান, যা বর্তমানে প্রায় ১৩.২% এবং গ্রামাঞ্চলেও এটি দ্রুত ছড়াচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশনের সর্বশেষ তথ্য ও গবেষণার ওপর ভিত্তি করে বর্তমানে ১ কোটি ৩৮ লাখ থেকে ১ কোটি ৩৯ লাখের মতো মানুষ এই রোগে ভুগছেন এবং বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সর্বাধিক ডায়াবেটিস আক্রান্ত দেশের তালিকায় ৮ম স্থানে রয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ২ কোটি ৩১ লাখে পৌঁছাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যেখানে ২০০০ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৮ লাখ। সবচেয়ে ভীতিকর বিষয় হলো, আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৩৯.১% থেকে ৪৩.৫% মানুষ জানেনই না যে তাদের ডায়াবেটিস রয়েছে, ফলে তারা কোনো চিকিৎসা ছাড়াই জটিলতার দিকে ধাবিত হচ্ছেন। এর বাইরে দেশের প্রায় ১ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসের পূর্ববর্তী স্তরে রয়েছেন, যা জীবনযাত্রার পরিবর্তন না হলে দ্রুত ডায়াবেটিসে রূপ নিতে পারে।
দেশের মোট রোগীর ৯০% এরও বেশি টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, যা মূলত অনিয়মিত জীবনযাপনের সাথে জড়িত এবং ৫% এর কম মানুষ টাইপ ১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। গ্রামীণ এলাকার তুলনায় শহর অঞ্চলে ডায়াবেটিসের প্রকোপ অনেক বেশি, যেখানে শহরে এই হার প্রায় ১৫% এবং গ্রামে ৮%। এছাড়া গর্ভবতী নারীদের মধ্যে এই হার প্রায় ৬% থেকে ১৪%। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না রাখার কারণে বাংলাদেশে অসংক্রামক ব্যাধিতে মৃত্যুর হার বাড়ছে এবং দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ১০% ঘটে ডায়াবেটিসজনিত জটিলতায়। এর পরিণতি হিসেবে হৃদরোগ ও স্ট্রোক, কিডনি অকেজো হওয়া, চোখের অন্ধত্ব এবং পা কেটে ফেলার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। ডায়াবেটিস হওয়ার আগের ধাপে রক্তে শর্করার পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে কিন্তু তা পূর্ণাঙ্গ ডায়াবেটিস নয়।
ডায়াবেটিসের ধরন এবং নতুন চিকিৎসাক্ষেত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশে আক্রান্তদের ৯০% এর বেশি মানুষই টাইপ ২ ডায়াবেটিসে ভুগছেন। ডায়াবেটিস কেবল একটি ব্যক্তিগত শারীরিক অসুস্থতা নয়, এটি একটি পরিবার ও রাষ্ট্রের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ। আজ মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের একজন সদস্য ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে, নিয়মিত ইনসুলিন, ওষুধ ও ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার খরচ মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমগুলোতে তাই বারবার উঠে আসছে ‘ইনসুলিন অ্যাক্সেস’ বা জীবনরক্ষাকারী ওষুধের আকাশচুম্বী দামের বিষয়টি। আশার কথা হলো, সচেতনতা আর একটুখানি জীবনযাত্রার পরিবর্তনই পারে এই পরিস্থিতি পাল্টে দিতে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে কোটি কোটি মানুষ এই পূর্ববর্তী স্তরে ভুগছেন, তবে এই ধাপে সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে ডায়াবেটিস পুরোপুরি প্রতিরোধ বা পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক অগ্রগতিতে এমন ত্রিবিধ ক্রিয়ার ওষুধ এসেছে যা একই সাথে রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে, ওজন কমায় এবং হৃৎপিন্ডকে সুরক্ষা দেয়। ডায়াবেটিস পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য না হলেও একে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন খাদ্যাভ্যাসে ও জীবনযাত্রার শৃঙ্খলা। প্রতিদিন অন্তত ত্রিশ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা শারীরিক পরিশ্রমকে অভ্যাসে পরিণত করা জরুরি। শরীর ও মনের প্রতি একটু যত্নশীল হয়ে এই নীরব মহামারীকে রুখে দেওয়ার সম্ভব।
লেখক : শিক্ষার্থী, গার্হস্থ্য অর্থনীতি , ইডেন মহিলা কলেজ ।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/190261