ঋণ যেন গরীবের কাছে পাহাড় সমান বোঝা
বাংলাদেশে গরীব মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম ‘ঋণ’। প্রতিদিনকার বেঁচে থাকার লড়াইয়ে যেখানে একবেলা দুমুঠো খাবার জোটানোই কঠিন ব্যাপার, সেখানে ঋণ যেন দরিদ্রের গলায় কাঁটার মতো বিধে থাকে, তারা না পারে এই কাঁটা গিলে ফেলতে; না পারে উপরে ফেলতে। গরিব মানুষ ঋণ নেয় বাঁচার জন্য চাল, ডাল, লবণ কিংবা নিত্যদিনের চাহিদা পুরনে; সন্তানের পড়াশোনা চালাতে; অসুস্থ বাবা-মাকে হাসপাতালে নিতে, নিজের ছোট্ট কোনো স্বপ্ন পূরণ করতে। কিন্তু এই বাঁচার ঋণই হয়ে ওঠে মৃত্যুর ফাঁদ। যেই ফাঁদ মানুষ খেকো, সহজেই গোগ্রাসে গিলে ফেলতে পারে। একজন মা যখন ছেলের স্কুলের খাতা-কলম কেনার জন্য ঋণ নেয় তখন সেটা তার কাছে আশার আলো। কিন্তু সেই ঋণই একদিন যখন তাকে কিস্তির দমচাপে গলায় দড়ি দিতে বাধ্য করে, তখন ঋণ হয়ে যায় পাহাড় সমান বোঝা।
বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ। এদেশের একটি উল্লেখযোগ্য মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গিয়েছে, দেশে এখন ৩০% মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করছে। এর মধ্যে ৯.৩৫% মানুষ চরম দরিদ্রতায় দিন কাটাচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে প্রায় ৪৬% পরিবার। অর্থাৎ প্রতি দুইজন লোকের মধ্যে একজনই ঠিকমতো খেতে পাচ্ছে না। শহর থেকে গ্রাম -সবখানেই দরিদ্রতার গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। গরিব পরিবারগুলো প্রতিদিন বাজারে গিয়ে ফিরছে হতাশ হয়ে, কারণ চাল, ডাল, তেল, সবজিসহ নিত্যপণ্যের দাম তাদের নাগালের বাইরে। ফলে তাদের এই মৌলিক চাহিদা পূরনের জন্য একটা বিশাল অংশ ঋণের পথ বেছে নিচ্ছে।
আরেকদল হচ্ছে আমাদের কৃষক সমাজ। যারা আমাদের মুখে দৈনিক আহারের ব্যবস্থা করে তারা নিজেরাই আধপেটা খেয়ে অতি কষ্টে দিনাতিপাত করছে। প্রত্যেকবার ফসল বুননের সময় আসলে তাদের চড়া সুদে ঝণ নেওয়ার পথ বেছে নিতে হয়। কারণ তারা তাদের ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় বিশাল এক সিন্ডিকেটের শিকার হয় প্রতিবছরই। পরবর্তীতে সেই ঋণের কিস্তি চালানো তাদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। অনেকে ঝণ পরিশোধ করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে কৃষকের আত্মহত্যা কোনো অবাক হওয়ার বিষয় নয়, কারণ এখন বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে অহরহ এমন ঘটনা ঘটে চলেছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন এনজিও থেকে নেওয়া ঋণ শোধ করতে ও চাপ সহ্য করতে না পেরে রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলায় কৃষক আকবর আলী নিজের গলায় ফাঁস দেন। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে বগুড়ার আব্দুল করিম নামের এক কৃষক বিভিন্ন এনজিও ও ব্যক্তিগত সূত্র থেকে ঋণ নিয়ে ফসল নষ্ট হওয়ায় ঋণ শোধ করতে না পেরে, ঋণদাতারার চাপে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন। আবার, ঋণদাতা কর্তৃক মামলায় অনেকে হেনস্তার শিকার হয়েও আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
ঋণ যেমন গরিবের কাছে পাহাড়সম বোঝা তেমন ধনীদের কাছে নতুন “সুযোগ”। তারা ছোটখাটো ঋণ করে না, বড় বড় দান মারে। তারপর বিদেশে পালিয়ে যায়। দেশ তালি দিয়ে এহেন কাজে বাহবা দেওয়া ছাড়া কিছুই করে না। সরকার আর ব্যাংক তাকে ‘ডিফল্টার’ বলে ক্ষমা করে। অথচ দিনমজুর, কৃষক বা বিধবা মা ২০ হাজার টাকার এনজিও ঋণ শোধ করতে না পারলে তাকে লজ্জা, মামলা, অপমান আর আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। একজন দিনমজুর যখন ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারে না, তখন তার বুকের ভেতর পাহাড় গড়ে ওঠে। সেই পাহাড়ের চাপেই ভেঙে পড়ে সংসার, ভেঙে পড়ে স্বপ্ন, ভেঙে পড়ে মানুষ। ঋণ গরিবের কাছে সত্যিই পাহাড় সমান বোঝা। এ দেশের গরিব মানুষ ঋণ নেয় বাঁচতে। কিন্তু এই বাঁচার ঋণই একসময় তার জন্য গলার দড়ি হয়ে দাঁড়ায়। ঋণ এখন শুধু টাকার হিসাব নয় এটা মানুষের স্বপ্নভাঙা, সম্মানহারা আর জীবন ধ্বংসের অন্য নাম।
একজন ধনী ব্যবসায়ী যখন ঋণ নেন, সেটা তাঁর জন্য বিনিয়োগ। কিন্তু একজন গরিব যখন ঋণ নেয়, সেটা হয়ে যায় তার বেঁচে থাকার শর্ত। ধনী ঋণ নিলে তাকে “উদ্যোক্তা” বলা হয়, গরিব ঋণ নিলে তাকে “ডিফল্টার” বলা হয়। এই বৈষম্যই গরিব মানুষের কাছে ঋণকে পাহাড় বানিয়ে দিয়েছে। এনজিও ঋণ শুরুর উদ্দেশ্য ছিল সহায়তা। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রে তা পরিণত হয়েছে উচ্চসুদের ‘কিস্তির ফাঁদে’। সেই ফাঁদে পা দিয়ে আজ অনেক জীবন একটু সুদের চক্রে আবদ্ধ হয়ে গেছে যা থেকে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব। তাছাড়া, মূল্যস্ফীতি ও বাজার অস্থিরতা অন্যতম আরেকটি কারণ। যে হারে চাল, ডাল, তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ সহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে সেই হারে গরিবের আয় বাড়ছে না, ফলে ক্রয়ক্ষমতা ভেঙে পড়ছে। মানুষ ঝণের দিকে ঝুকছে।
যে পরিমাণ চাহিদা, সে পরিমাণ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও নেই। ফলে যুবসমাজের একটি বিশাল অংশ বেকারত্বে ভুগছে। কর্মসংস্থান না থাকায় দিনমজুরি বা কৃষিজীবী আয়ে সংসার চালানো অসম্ভব। তাই ঋণ ছাড়া স্বল্প আয়ের লোকজনের হাতে আর কোনো পথ খোলা থাকে না। আবার অনেকসময় অনেকে না বুঝে পাহাড়সম ঋণ নিয়ে বসে। ঋণ পরিশোধ কিভাবে করবে তার কোনো পূর্বপরিকল্পনা থাকেনা। ফলে নিজের অজান্তেই তারা ঝণের বেড়াজালে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে পড়ে। সরকারের এক্ষেত্রে একটা বড় দায়বদ্ধতা আছে। সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা বা সহায়তা কার্যকরভাবে গরীব, হতদরিদ্র ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছায় না। সরকারি ব্যাংকের সহজ ঋণ দেওয়া হয়েছে বড় লোকদের জন্য, গরিবের জন্য নয়। ফলে গরিবেরা সদাসর্বদাই বৈষম্যের শিকার।
ঋণ গরিবের জন্য আশীর্বাদ নয়, অভিশাপ। প্রতিটি আত্মহত্যা, প্রতিটি হত্যা, প্রতিটি মামলা প্রমাণ করছে ঋণের বোঝা শুধুই আর্থিক নয়, এটি মানবিক বিপর্যয়। যখন একজন গরিব মানুষ কিস্তির টাকা শোধ করতে না পেরে সন্তানের স্কুল ছাড়িয়ে দেয় অথবা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, তখন সেটি শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের ব্যর্থতা। রাষ্ট্র যদি এখনই দরিদ্রের পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে ঋণের পাহাড় চাপা দিয়ে গরিব মানুষের স্বপ্ন, আশা আর জীবন একে একে মরে যাবে। তাই আসুন, সকলে এখনই দরিদ্রের পাশে দাঁড়াই, তাদের বাঁচার আরেকবার সুযোগ করে দিই।
লেখক : শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/189930