মাঝরাতে কেন বিড়াল কাঁদে?
লাইফস্টাইল ডেস্ক : চারপাশে নীরবতা, মাঝে মাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া কিছুই শোনা যাচ্ছে না। ঘরের সবাই গভীর ঘুমে। হঠাৎ বাইরে থেকে ভেসে এলো শিশুর কান্নার মতো তীক্ষ্ণ এক আওয়াজ। কখনো মনে হচ্ছে কেউ গোঙাচ্ছে, কখনো আবার শোনা যাচ্ছে দীর্ঘ হাহাকারের মতো শব্দ। জানালা দিয়ে উঁকি দিতেই দেখা গেল, আশপাশে কোনো মানুষ নেই। ভয়ে আতঙ্কে অনেকের ঘাম ছুটে যায়। কেউ কেউ আবার সাহস করে খোঁজা শুরু করেন শব্দের উৎস। গিয়ে দেখলেন শব্দটি করছে একটি বিড়াল! এমন দৃশ্য বা অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়েছে।
লোকমুখে প্রচলিত আছে, রাতের বেলা বিড়ালের কান্না নাকি অশুভ কিছুর ইঙ্গিত। কিন্তু সত্যিই কি তাই? নাকি এর পেছনে রয়েছে বিড়ালের স্বাভাবিক আচরণ, ক্ষুধা কিংবা শারীরিক কোনো সমস্যা?পশু বিশেষজ্ঞদের মতে, বিড়ালের অদ্ভুত ডাকের সঙ্গে অলৌকিক বা অশুভ ঘটনার কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক নেই। বরং বিভিন্ন প্রয়োজন, অনুভূতি ও পরিস্থিতি বোঝাতেই বিড়াল নানা ধরনের শব্দ করে। বিশেষ করে রাতের নীরবতায় সেই আওয়াজ আরও স্পষ্ট ও ভয়ংকর মনে হতে পারে।রাতে কেন বেশি ডাকাডাকি করে বিড়াল?বিড়াল পুরোপুরি নিশাচর প্রাণী নয়। তারা সাধারণত ভোর ও সন্ধ্যার সময় বেশি সক্রিয় থাকে। দিনের বড় একটা সময় ঘুমিয়ে কাটানোর পর সন্ধ্যা কিংবা গভীর রাতে তাদের খেলাধুলা, ঘোরাঘুরি ও খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়তে পারে। এ সময় মানুষের মনোযোগ পেতেও তারা ডাকাডাকি করে।
দিনের বেলায় পর্যাপ্ত খেলাধুলা বা সঙ্গ না পেলে রাতের বেলা একঘেয়েমি থেকেও এমন আচরণ দেখা যায়।বিড়ালের কান্নার পেছনে যেসব কারণ রয়েছে
১. ক্ষুধা বা খাবারের চাহিদাবিড়াল নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খেতে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারে। খাবার দেওয়ার সময় পেরিয়ে গেলে কিংবা পেট ভরা না থাকলে তারা জোরে ডাকতে পারে। অনেক পোষ্য বিড়াল মালিককে ঘুম থেকে জাগিয়ে খাবার চাইতেও এমন শব্দ করে।
২. সঙ্গ ও মনোযোগের প্রয়োজনবিড়ালকে অনেকেই একা থাকতে পছন্দ করে এমন প্রাণী মনে করেন। কিন্তু তারাও মানুষের সঙ্গ, আদর ও খেলাধুলা উপভোগ করে। দীর্ঘ সময় একা থাকলে কিংবা মালিকের মনোযোগ না পেলে ডাকাডাকি করতে পারে। কখনো দরজা খুলে বাইরে যেতে বা ঘরে ফিরতেও তারা একইভাবে শব্দ করে।
৩. প্রজননের সময় সঙ্গী খোঁজারাতে বিড়ালের দীর্ঘ ও তীক্ষ্ণ ডাকের অন্যতম পরিচিত কারণ প্রজনন। প্রজননক্ষম মেয়ে বিড়াল সঙ্গী আকর্ষণ করতে জোরে জোরে ডাকতে পারে। পুরুষ বিড়ালও আশপাশে মেয়ে বিড়ালের উপস্থিতি টের পেলে সাড়া দিয়ে ডাকাডাকি করে। এ সময় একাধিক বিড়ালের মধ্যে তর্ক, ধাওয়া কিংবা মারামারিও হতে পারে। বিশেষ করে যেসব বিড়ালের বন্ধ্যাকরণ করা হয়নি, তাদের মধ্যে এমন আচরণ বেশি দেখা যায়।
৪. ভয়, অস্বস্তি বা নিজের এলাকা রক্ষাবাড়ির আশপাশে অন্য বিড়াল বা অপরিচিত প্রাণী দেখলে নিজের এলাকা রক্ষার জন্য বিড়াল গর্জন বা দীর্ঘ স্বরে ডাকতে পারে। নতুন পোষ্য, বাড়ি বদল, অপরিচিত মানুষ কিংবা দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তনও তাদের উদ্বিগ্ন করে তুলতে পারে। সেই অস্বস্তি প্রকাশের একটি উপায় হলো ডাকাডাকি।
৫. ব্যথা বা অসুস্থতাহঠাৎ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ডাকাডাকি শুরু করলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। দাঁতের সমস্যা, আঘাত, বাতের ব্যথা, প্রস্রাবের সমস্যা কিংবা কিডনি ও থাইরয়েডের অসুখের কারণে বিড়াল অস্বাভাবিক শব্দ করতে পারে। খাওয়ায় অনীহা, অস্থিরতা, লুকিয়ে থাকা বা প্রস্রাব করতে কষ্ট হওয়ার মতো লক্ষণও দেখা দিতে পারে।
৬. বয়স বাড়লে বিভ্রান্তিবয়স্ক বিড়ালের ক্ষেত্রে রাতে একটানা ডাকাডাকির পেছনে থাকতে পারে বয়সজনিত শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন। বিশেষ করে ১০ বছর বা তার বেশি বয়সী বিড়ালের মধ্যে কখনো কখনো স্মৃতিশক্তি ও স্থান চিনতে পারার সমস্যা দেখা দেয়। ঘুম ও জেগে থাকার স্বাভাবিক ছন্দ বদলে যেতে পারে। ফলে রাতে একা ঘুরে বেড়ানো কিংবা কারণ ছাড়াই জোরে ডাকতে পারে।বিড়ালের কান্না শুনলে কী করবেন?বাইরে কোনো বিড়াল ডাকলে ভয় পেয়ে তাড়িয়ে দেওয়া বা আঘাত করা উচিত নয়। নিরাপদ দূরত্ব থেকে বোঝার চেষ্টা করুন, প্রাণীটি আহত কি না, কোথাও আটকে আছে কি না কিংবা খাবার-পানির প্রয়োজন আছে কি না।
পোষ্য বিড়াল হলে তার খাবার, পানি ও থাকার জায়গা পরীক্ষা করুন। নিয়মিত খেলাধুলার সুযোগ এবং নির্দিষ্ট খাবারের সময়ও রাতের অস্থিরতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।তবে পোষ্য বিড়াল হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে ডাকতে শুরু করলে, বিশেষ করে সঙ্গে ব্যথা, খাওয়ায় অনীহা বা প্রস্রাবের সমস্যা থাকলে পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। শুধু বয়সের কারণে এমন হচ্ছে ভেবে বিষয়টি এড়িয়ে যাবেন না।
অতএব, মাঝরাতে বিড়ালের কান্না শুনে অশুভ কিছুর আশঙ্কা করার কারণ নেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এটি তার কোনো প্রয়োজন, অনুভূতি কিংবা শারীরিক অস্বস্তির প্রকাশ। শব্দটির পেছনের কারণ বুঝতে পারলেই ভয় নয়, বরং প্রাণীটির প্রতি সহানুভূতি দেখানো সম্ভব।তথ্যসূত্র: এএসপিসিএ, করনেল ইউনিভার্সিটি
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/189169