রূপপুরে বিদ্যুতের পথে বড় অগ্রগতি, গ্রিডে যাচ্ছে ৩০০ মেগাওয়াট
পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর পথে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করেছে। কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর পর এবার ‘পাওয়ার স্টার্ট’ বা সি-স্টেজের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা)। এ পর্যায়ে ধারাবাহিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে চুল্লি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং কার্যকারিতা যাচাই করা হবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার বিকেলে ভৌত পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনার ভিত্তিতে পরবর্তী ধাপের কাজ শুরুর অনুমোদন দেয় বায়েরা। এই পর্যায়ে চুল্লির ক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়িয়ে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। উৎপাদনক্ষমতা শূন্য থেকে ৩০ শতাংশে পৌঁছালে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাছান জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলেই পাওয়ার স্টার্ট বা সি-স্টেজের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ ধাপেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলবে। শূন্য শক্তি উৎপাদন দিয়ে কার্যক্রম শুরু হবে।
উৎপাদনক্ষমতা ৩০ শতাংশে পৌঁছালেই জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা যাবে।
ধাপে ধাপে বাড়বে উৎপাদন
রূপপুরে পারমাণবিক জ্বালানির বিক্রিয়ার মাধ্যমে তাপশক্তি উৎপাদন করা হবে। সেই তাপ দিয়ে পানি থেকে বাষ্প তৈরি করে ঘোরানো হবে টারবাইন। টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত জেনারেটরের মাধ্যমে উৎপাদিত হবে বিদ্যুৎ।
এ প্রক্রিয়ায় চুল্লির ক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে চুল্লি, শীতলীকরণ ব্যবস্থা, টারবাইন, জেনারেটর, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করা হবে। উৎপাদনক্ষমতা ৩০ শতাংশে পৌঁছালে প্রথম ইউনিট থেকে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে। এ কার্যক্রম আগামী ডিসেম্বরে শুরু হতে পারে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, পাওয়ার স্টার্ট ধাপে শুরুতে সীমিত পরিসরে তাপশক্তি উৎপাদন করা হবে। পরে পর্যায়ক্রমে তা বাড়ানো হবে। গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের আগে প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা ও যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা যাচাই করা হবে। পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরুর পর এ প্রক্রিয়া টানা সাত থেকে আট মাস চলতে পারে।
নিরাপত্তা পরীক্ষায় পেরিয়ে এসেছে একাধিক ধাপ
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে পারমাণবিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনা ছিল গত সেপ্টেম্বরে। তবে নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ায় কার্যক্রম পিছিয়ে যায়। পরে ত্রুটি-সংক্রান্ত কাজ শেষ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নিয়ে ১১ অক্টোবর প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয়।
পারমাণবিক চুল্লিপাত্রের ভেতরে বিক্রিয়ার আচরণ যাচাই এবং উৎপাদনসংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা পরীক্ষা করার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ভৌত পরীক্ষা বা ফিজিকস টেস্ট। এ পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনার পরই পরবর্তী পর্যায়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শুরুর আগে বায়েরা থেকে অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। তাই পাওয়ার স্টার্টের অনুমোদনকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বিশ্বের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় আসার অপেক্ষা
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। কেন্দ্রটির পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান এনপিসিবিএল।
রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট রূপপুরে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট করে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে।
কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নাম যুক্ত হবে। এর আগে ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি পৌঁছানোর পর রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র পারমাণবিক স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তবে পারমাণবিক জ্বালানি গ্রহণ এবং বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু এক বিষয় নয়; গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের আগে আরও পরীক্ষা ও অনুমোদনের ধাপ রয়েছে।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/189112