হিমাগার নির্মাণই সাফল্য নয়, কৃষকের সুফল নিশ্চিত করতে হবে
বগুড়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সবজি উৎপাদন ও বিপণনকেন্দ্র। মহাস্থান হাটসহ জেলার বিভিন্ন বাজারে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য কেনাবেচা হয়। কিন্তু উৎপাদন ভালো হলেও সংরক্ষণ, পরিবহন ও সময়মতো বাজারজাতকরণের দুর্বলতায় কৃষককে লোকসান গুনতে হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে ২০২৬ সালের ২ অক্টোবর দি ফিনান্সিয়াল এক্্রপ্রেস জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বগুড়ায় ৫ লাখ ১৬ হাজার ৮৬৭ টন সবজি উৎপাদিত হয়েছিল। এর মধ্যে ১ লাখ ১২ হাজার টনের বেশি অবিক্রীত থেকে নষ্ট হয়। এর আনুমানিক আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৩৯৫ কোটি টাকা।
এই অপচয় কমাতে কৃষকের কাছাকাছি সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এ লক্ষ্যেই জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে কৃষি মন্ত্রণালয় ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সাশ্রয়ী কোল্ডস্টোরেজ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি’ প্রকল্প গ্রহণ করে।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট প্রাথমিকভাবে সারাদেশে ১০০টি ফারমার্স মিনি কোল্ড স্টোরেজ বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। ঘরভিত্তিক মডেলে প্রায় ১০ টন পণ্য সংরক্ষণের সক্ষমতা ও প্রায় ৫ লাখ টাকা ব্যয় এবং কনটেইনারভিত্তিক মডেলে প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ের কথা জানানো হয়েছিল।
প্রচলিত বড় হিমাগারের তুলনায় কম খরচে উৎপাদন এলাকার কাছে সংরক্ষণসুবিধা পৌঁছে দেওয়াই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। কৃষক যেন বাজারে দরপতনের সময় বাধ্য হয়ে ফসল বিক্রি না করে উপযুক্ত সময়ে বাজারজাত করতে পারেন, সেটিই প্রত্যাশিত সুফল। তবে সংরক্ষণ করলেই দাম বাড়বে এমন নিশ্চয়তা নেই। ফসলের ধরন, সংরক্ষণ ব্যয়, বাজারের চাহিদা, সরবরাহ এবং সরকারি আমদানি নীতিও কৃষকের লাভ-লোকসানে প্রভাব ফেলে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নতুন হিমাগার স্থাপনের পাশাপাশি বিদ্যমান স্থাপনাগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করা জরুরি। কারণ, সাম্প্রতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বগুড়ার শিবগঞ্জ, গাবতলী ও সারিয়াকান্দিতে স্থাপিত আটটি সৌরবিদ্যুৎচালিত কনটেইনারভিত্তিক মিনি হিমাগারের অধিকাংশ তালাবদ্ধ অথবা ফসলবিহীন ছিল। পরিদর্শন করা ইউনিটগুলোর কোনোটিতেই সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা ব্যবহৃত হচ্ছিল না। কয়েকজন পরিচালকের বক্তব্যে প্রশিক্ষণের অভাব, কৃষকের অনাগ্রহ ও পরিচালন ব্যয়ের সমস্যাও উঠে আসে। এরপর ৭ অক্টোবর ২০২৬ এর যায়যায়দিন প্রতিবেদনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের তদন্তের বরাতে আরও উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশজুড়ে পরিদর্শন করা ২৬টি মিনি হিমাগারের অধিকাংশ বন্ধ অথবা দুর্বলভাবে পরিচালিত হচ্ছিল। দুটি প্রকল্পে মোট ১৮০টি হিমাগার স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১৫০টি নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বিদ্যুৎ সংযোগের ঘাটতি, অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয় ও সংরক্ষিত পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার অভিযোগও উঠে আসে। একই প্রতিবেদনে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে আরও দুই হাজার সৌরবিদ্যুৎচালিত মিনি হিমাগার স্থাপনের প্রস্তাব নিয়ে সংশয়ের কথা বলা হয়।
এগুলো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তদন্তের বিবরণ; প্রকল্পগুলোর চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য মূল তদন্ত প্রতিবেদন ও সরকারি নথি পর্যালোচনা প্রয়োজন। তবু প্রকাশিত তথ্যগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করে অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে প্রশিক্ষণ, পরিচালন সক্ষমতা ও বাজারসংযোগ নিশ্চিত না করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
এখানে সরকারি বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। বিগত সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে দামি চিকিৎসাযন্ত্র স্থাপনের পরও বিভিন্ন কারণে সেগুলো চালু না থাকা কিংবা রেলসহ বিভিন্ন অবকাঠামো যথাযথভাবে ব্যবহার না করার অভিযোগ থেকে যে শিক্ষা পাওয়া যায়, তা ভুলে গেলে হবেনা। জনগণের করের অর্থে স্থাপিত কোনো সম্পদ অব্যবহৃত পড়ে থাকলে আর্থিক ব্যয়ের পাশাপাশি জনস্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই নতুন প্রকল্প অনুমোদনের আগে বিদ্যমান বিনিয়োগের সুফল নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।
সারাদেশে এখন নতুন হিমাগার নির্মাণের সংখ্যা বাড়ানোর আগে বিদ্যমানগুলোকে সচল করা জরুরি। প্রথমত, প্রতিটি ইউনিটের যন্ত্রপাতি, সৌরবিদ্যুৎ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালন ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আলু, টমেটো, কাঁচা মরিচ, বেগুনসহ ফসলভেদে উপযুক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার নির্দেশিকা দিতে হবে। তৃতীয়ত, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, ব্যক্তির হাতে না দিয়ে কৃষক সমবায়ের মাধ্যমে পরিচালনা করতে হবে। পঞ্চমত, মহাস্থান হাটের পাইকার, আড়তদার, সুপারশপ ও প্রক্রিয়াজাতকারীদের সঙ্গে বাজারসংযোগ স্থাপন করতে হবে। ষষ্ঠত, সংরক্ষণ খরচ ও সম্ভাব্য লাভের সহজ হিসাব কৃষককে দেখাতে হবে। সপ্তমত, কৃষি ঋণকে শুধু যন্ত্রপাতি কেনার জন্য নয়, মেরামত, কার্যকরী মূলধন, প্যাকেজিং ও পরিবহনের জন্যও ব্যবহার করতে হবে।
ব্যাংকসমূহও কৃষিমূল্য শৃঙ্খলভিত্তিক অর্থায়নের মাধ্যমে ভূমিকা রাখতে পারে। হিমাগার মেরামত, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা সচল রাখা, প্যাকেজিং, কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও পরিবহনের জন্য উপযুক্ত ঋণ দেওয়া যেতে পারে। তবে ঋণ অনুমোদনের আগে প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যবহার, পরিচালন ব্যয়, বাজারসংযোগ ও পরিশোধ সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি। সবশেষে, প্রকল্পের সাফল্য শুধু কতটি হিমাগার নির্মিত হয়েছে, তা দিয়ে বিচার করা যাবে না। কতজন কৃষক নিয়মিত ব্যবহার করছেন, কত পণ্য নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পাচ্ছে, কৃষকের নিট আয় কতটা বাড়ছে এবং স্থাপনাগুলো নিজেদের পরিচালন ব্যয় মেটাতে পারছে কি না এসব সূচকই হতে হবে মূল্যায়নের ভিত্তি। এখন প্রয়োজন সেই উৎপাদনকে সঠিক সংরক্ষণ ও বাজারব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষকের আয়ে রূপান্তর করা। তাই নতুন হিমাগার নির্মাণের সংখ্যা বাড়ানোর আগে বিদ্যমানগুলোকে কার্যকর কৃষিসম্পদে পরিণত করতে হবে। হিমাগার নির্মাণ প্রকল্পের সাফল্য নয়; কৃষকের ফসল রক্ষা, আয় বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের কার্যকর ব্যবহারই সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি। সরকারের একটি স্লোগানের কথা ভুললে চলবেনা, কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ,সবার জন্য বাংলাদেশ।
লেখক: ব্যাংকার ও কৃষি গবেষক
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/188987