দেশের টিউশনি ব্যবস্থা: আয় ও অনিয়মের থাবা

দেশের টিউশনি ব্যবস্থা: আয় ও অনিয়মের থাবা

রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর বর্তমান চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই হতাশাজনক। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার পাশাপাশি নিজের ব্যক্তিগত ও পড়াশোনার খরচটুকু নিজে বহন করার ইচ্ছা অধিকাংশ শিক্ষার্থীরই থাকে। এই ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে পছন্দের মাধ্যম টিউশন। এর মাধ্যমে যেমন কিছুটা অর্থ উপার্জন সম্ভব, তেমনি নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি পায়। ফলে সাধারণ ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের কাছে টিউশনি শুধু একটি কর্ম নয় বরং আত্মনির্ভরশীল হওয়ার প্রথম পদক্ষেপ। উচ্চশিক্ষার খরচ সামলাতে গিয়ে পরিবারকে বাড়তি আর্থিক চাপে না ফেলা এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এই প্রয়াস একজন তরুণ শিক্ষার্থীর জীবনে অত্যন্ত গৌরবময় একটি অধ্যায়। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষার্থীদের এই তীব্র আর্থিক প্রয়োজন ও চাহিদাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে টিউশন মিডিয়া নামধারী এক শ্রেণির মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান ও চক্র। 

একজন শিক্ষার্থীকে টিউশন খুঁজে দেওয়ার বিনিময়ে তারা নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশন দাবি করে। নীতিগতভাবে এতে কোনো আপত্তি থাকার কথা নয় কারণ শিক্ষার্থী যেমন অর্থের বিনিময়ে পড়ান, তেমনি মধ্যস্থতাকারীরাও তাদের সেবার বিনিময়ে আয় করতে পারেন। একটি সুষ্ঠু সেবা কাঠামোর মাধ্যমে এটি চালিত হলে উভয় পক্ষই উপকৃত হতে পারে। কিন্তু দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, এই পুরো ব্যবস্থাটি বর্তমানে অনিয়ম, অস্বচ্ছতা ও একতরফা শোষণে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হলো কাজ শুরুর আগেই অগ্রিম টাকা দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করার চাপ। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের মধ্যে কথাবার্তা চূড়ান্ত হওয়ার পরও মিডিয়া থেকে দাবি করা হয় অগ্রিম কমিশন বা রেজিস্ট্রেশন ফি। 

প্রথম মাসের বেতন পাওয়ার পর টাকা পরিশোধের প্রস্তাব দিলে তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং টাকা না দিলে টিউশন বাতিলের হুমকি দেওয়া হয়। অনলাইনে অচেনা কোনো মাধ্যমকে টিউশন শুরুর আগেই অগ্রিম অর্থ প্রদান করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ। যেখানে শিক্ষার্থী এখনো পড়ানোই শুরু করেননি এবং কোনো বেতনও পাননি, সেখানে আগাম অর্থ দাবি করার কোনো নীতিগত বা যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি থাকতে পারে না। টিউশনের নাম করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বায়োডাটা, জাতীয় পরিচয়পত্র, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র এবং ক্লাসের সময়সূচীর মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। কিন্তু অর্থ পরিশোধের বিষয়টি সামনে আসলেই সেটিকে প্রধান শর্ত বানিয়ে ফেলা হয়। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, অনেক ভুয়া টিউশন মিডিয়া অগ্রিম টাকা নেওয়ার পর যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় বা মোবাইল নম্বর ব্লক করে দেয়। ফলে একজন শিক্ষার্থী আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং একটি সম্ভাবনাময় সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন। প্রতারিত হওয়ার পর অনেক শিক্ষার্থী লজ্জায় বা আইনি জটিলতার ভয়ে কারো কাছে অভিযোগ জানাতেও পারেন না, যা চক্রগুলোকে আরও বেশি বেপরোয়া করে তোলে। 

অন্যদিকে, যেসব মিডিয়া শুরুতে টাকা নেয় না, তারাও প্রথম মাসের বেতনের একটি বড় অংশ সাধারণত ৫০ শতাংশ কমিশন হিসেবে গ্রহণ করে। এটিকে মেনে নিলেও পরবর্তীতে তৈরি হয় ভিন্নধর্মী প্রতারণা। কমিশন পাওয়ার কিছুদিন পরই অনেক মিডিয়া অভিভাবককে নতুন ও তথাকথিত ভালো শিক্ষকের প্রলোভন দেখিয়ে আগের শিক্ষককে বাদ দেওয়ার ব্যবস্থা করে। ফলে মাত্র এক  দুই মাসের মধ্যেই শিক্ষার্থী তার টিউশনটি হারান এবং ওই মিডিয়া নতুন শিক্ষকের কাছ থেকে পুনরায় কমিশন আদায়ের অনৈতিক সুযোগ পায়। এই কমিশন চক্রের বলি হচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এটি কেবল একতরফা শোষণ নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক প্রতারণারই একটি ভিন্ন রূপ। এখানে অনুধাবন করা প্রয়োজন, একজন শিক্ষার্থীর টিউশন পাওয়ার পেছনে শুধু অর্থই ব্যয় করেন না; তার মূল্যবান সময়, শ্রম ও প্রত্যাশাও এর সাথে জড়িয়ে থাকে। ক্লাস বা পরীক্ষার ব্যস্ততার মাঝে সময় মেলানো এবং যাতায়াতের ঝুঁকি সামলানোর পর যখন এমন অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয়, তখন তার ক্ষতিটা আর শুধু আর্থিক থাকে না, বরং তা মানসিক স্বাস্থ্যেও বড় আঘাত হানে। 

বিশেষ করে রাজধানী শহরের তীব্র যানজট ঠেলে যাতায়াত করা একজন শিক্ষার্থীর জন্য অত্যন্ত পরিশ্রমের বিষয়। সেই শ্রমের সঠিক মূল্য না পাওয়া কিংবা বারবার প্রতারণার শিকার হওয়া যে কোনো তরুণ শিক্ষার্থীর জীবনের আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। শিক্ষার্থীদের সংগৃহীত ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অগ্রিম টাকা আদায়ের নামে প্রতারণা বন্ধ করা এবং কৌশলে শিক্ষার্থী সরিয়ে দেওয়ার এই অন্যায্য চর্চার বিরুদ্ধে এখনই প্রশাসনিক ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনকে পুঁজি করে এমন অনৈতিক বাণিজ্য চলতে দেওয়া যায় না। 

সাইবার নিরাপত্তা আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সুস্পষ্ট নিয়মকানুন নির্ধারণ করা এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। জেলা প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত এসব এজেন্সির বৈধতা যাচাই করে একটি তালিকা তৈরি করা। টিউশন মিডিয়ার উপস্থিতি বা তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক পাওয়ার অধিকারকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা হচ্ছে না। কিন্তু এই সুযোগ নিয়ে শিক্ষার্থীদের হয়রানি বা প্রতারণা করার অধিকার কারও থাকতে পারে না। একটি স্বচ্ছ, নিরাপদ ও জবাবদিহিমূলক টিউশনি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি যেখানে শিক্ষার্থী তার যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাবেন, অভিভাবক পাবেন উপযুক্ত শিক্ষক এবং মধ্যস্থতাকারীরা পাবেন তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক। একটি টিউশন পাওয়ার আশায় যেন কোনো শিক্ষার্থীকে নিজের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, অর্থের নিশ্চয়তা কিংবা আত্মসম্মানের সাথে আপস করতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করাই হোক মূল লক্ষ্য।

লেখক : শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি, ইডেন ক্যাম্পাস।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/188530