সরবরাহ সংকট ও হাতবদলে চড়া দাম এলপিজির

সরবরাহ সংকট ও হাতবদলে চড়া দাম এলপিজির

স্টাফ রিপোর্টার : এক লাফে ১২ কেজি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ২৫২ টাকা বাড়ানোর পরও সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮শ’ ৩৭ টাকায় গ্যাস পাচ্ছেন না ভোক্তারা। প্রতিটি গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ১৯শ’ থেকে ১৯৫০ টাকায়।

গত মাসেও যেখানে ১৬শ’ থেকে ১৬৫০ টাকায় ১২ কেজির যে সিলিন্ডার মিলছিল সরকার দাম বাড়ানোর ফলে ভোক্তাকে অতিরিক্তি দামের সাথে আরও বেশি গুনতে হচ্ছে ৮০ থেকে ১শ’ টাকা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গত ৪ অক্টোবর নতুন করে ১২ কেজি এলপিজির দাম ১৫৮৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে, যা ঐদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়।

এদিকে দাম বাড়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের দাবি বিইআরসি যে দর ধরে প্রতি মাসে মূল্য সমন্বয় করে, বাস্তবে আমদানিকারকদের জাহাজ ভাড়া ও ডলারের দর ধরে আমদানি করতে তার চেয়ে বেশি খরচ পড়ছে। ফলে গত দুই মাস হলো বসুন্ধরাসহ বেশ কিছু কোম্পানীর গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় অন্যান্য কোম্পানী গুলোও ডিপো থেকে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে, যা পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে সংকট তৈরি করেছে।

বগুড়ার সুত্রাপুর এলাকার বাসিন্দা রাজিব আহম্মেদের তিন ছেলেমেয়ে এবং তারা স্বামী-স্ত্রী ও বাবা-মাসহ ৭ জনের পরিবারের জন্য  প্রতি মাসে প্রায় দুটি সিলিন্ডার গ্যাস লাগে। তিনি জানান, ১২ কেজি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ২৫২ টাকা বাড়ানোর পরও সরকার নির্ধারিত এ দরে গ্যাস পাচ্ছেন না তিনি। নির্ধারিত দামের চেয়ে আরও বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। তিনি  তার এলাকার একটি খুচরা দোকান থেকে বাসায় পৌছানো পর্যন্ত ১৯৫০ টাকায় একটি সিলিন্ডার কিনেছেন গত  সোমবার।

একই কথা জানালেন বগুড়া মহানগরের কলোনী এলাকার গৃহবধু শারমিন আক্তার। তিনি বলেন, সরকার দাম বাড়ানোর পরও সেই দামে গ্যাস পাচ্ছি না। ১২ কেজির সিলিন্ডার ১৯০০ থেকে ২০০০ হাজার টাকার নিচে মিলছে না। তাও আবার নিজের নির্ধারিত সিলিন্ডার নিয়েও আছে বেশ ঝামেলা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে দেশে প্রায় এক কোটি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ ব্যবহার হয় গৃহস্থালির রান্নার কাজে। এলপিজির চাহিদা এখন বছরে ১৫ লাখ টনের বেশি। দেশের এলপিজি বাজারের প্রায় ৯৯ শতাংশই বেসরকারি আমদানিকারকদের নিয়ন্ত্রণে।

কোম্পানিগুলোর দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রোপেন ও বিউটেনের দাম বাড়ার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে জাহাজ ভাড়া অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিইআরসি যে দর ধরে প্রতি মাসে বিইআরসি মূল্য সমন্বয় করে, বাস্তবে আমদানিকারকদের জাহাজ ভাড়া ও ডলারের দর ধরে আমদানি করতে তার চেয়ে বেশি খরচ পড়ছে। ফলে তারা ডিপো থেকে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে, যা পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে সংকট তৈরি করেছে।

জানা গেছে, বগুড়ায় ১২ ও ৩৫ কেজি এলপি গ্যাসের ডিলার আছে ৭ জন। ্এসব ডিলারের  আবার সাব ডিলার আছে ৬ থেকে ৭ জন। এরপর তাদের কাছ থেকে গ্যাস নিয়ে বিক্রি করার দোকানের  নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নেই।

খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, তারা সরকার নির্ধারিত দামে সরবরাহকারীদের থেকে গ্যাস পাচ্ছেন না। বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে বিধায় বাড়তি দামেই ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করছেন। বগুড়ার চেলোপাড়া এলাকার একজন খুচরা বিক্রেতা  নাম প্রকাশ  না করা শর্তে জানান, তারা নিজের খরচ দিয়ে স্থানীয় ডিলারদের কাছ থেকে ফ্রেস, যমুনা, আই, ওমেরো গ্যাস নিয়ে আসছেন  ১৮শ থেকে ১৮২০ টাকায়। সেখানে তারা বিক্রি করছেন ১৮৫০ থেকে ১৯৫০ টাকা। কোন কোন ক্ষেত্রে পৌছানোর ভাড়া নেয়া হচ্ছে।

একই কথা জানালেন শহরের জামিলনগর এলাকার  একজন খুচরা বিক্রেতা। তিনি জানান  তিনি শুধুমাত্র আই ও যমুনা গ্যাস  বিক্রি করছেন। তিনি ১২ কেজির যমুনা সিলিন্ডার কিনছেন ১৮২০ টাকা  বিক্রি করছেন ১৮৭০ টাকায়। উমেরা কিনছেন  ১৮৩০ টাকায় বিক্রি করছেন ১৯৫০ টাকায়।

বেশি দামের কথা বলতেই তিনি বলেন, সরকার যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে সেই দামে ডিলারদের কাছ থেকে আমরাই কিনতে পারি না। তাই আমরা যত টাকায় কিনবো একটু লাভ রেখে তেমনই তো বিক্রি করবো।                                                                   
এব্যাপারে বগুড়া বৌবাজার এলাকার একজন পরিবেশক জানান, আমরা বিইআরসির রেট অনুযায়ীই বিক্রি করতে চাই, কিন্তু বোতলজাতকারী কোম্পানিগুলো থেকে আমাদের চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার দেওয়া হচ্ছে না। যে ডিপো থেকে আগে দিনে ৫০০ সিলিন্ডার আসতো, সেখান থেকে এখন ১৫০ বা ২০০টি পাওয়া যাচ্ছে।

এছাড়াও বসুন্ধরাসহ আরও বেশ কয়েকটি গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ আছে। অনেক গ্রাহক সেসব সিলিন্ডার নিয়ে গ্যাসের সন্ধান করছেন  কিন্ত সেসব গ্যাসের  সরবরাহ না থাকায় তাদের গ্যাস দেয়া যাচ্ছে না। তখন তারা সেই সিলিন্ডার নিয়ে বিভিন্ন দোকানে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন। আবার কোম্পানিগুলো পরিবহন কমিশন ও ডিলার মার্জিন যে হিসাব করে, তাতে আমাদের খরচই ওঠে না। সরবরাহ কম থাকায় বাজারে এই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

বগুড়া শহরের কলোনী এলাকায় অবস্থিত যমুনা গ্যাসের ডিলার মিল্লাত হোসেন জানান, তারা সরকার নির্ধারিত দামেই গ্যাস কিনছেন। তার সাথে নিজেদের জন্য কিছু রেখে  ১৮শ থেকে ১৮১০ টাকায় খুচরা বিক্রেতাদের  গ্যাস সরবরাহ করছেন। খুচরা বিক্রেতারা তাদের কাছে থেকে নিয়ে কত টাকা বেশি বিক্রি করছে তা তারা জানেন না।

১২ কেজি বসুন্ধরা সিলিন্ডার গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ আছে প্রায় দুই মাসের কাছাকাছি। এব্যাপারে বগুড়া মহানগরের বারপুর এলাকার বসুন্ধরা গ্যাস কোম্পানীর নির্ধারিত ডিলার সাদ এন্ড সাবিত এন্টারপ্রাইজের রুহুল আমিন রাজু জানান, সরবরাহ না থাকায় তারা দোকান বন্ধ করে বসে আছেন। এ অবস্থায় তাদের যেসব ভোক্তা আছেন তারা সিলিন্ডার নিয়ে বিপাকে আছেন। অন্য কোম্পানীর গ্যাস নিতে তাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। কবে নাগাদ এইগ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক হবে তা তিনি বলতে পারেননা।

এ ব্যাপারে বগুড়া জেলা এলপি গ্যাস পরিবেশক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাফিকুর রহমান সাফি জানান, বগুড়াসহ সারা দেশে সিলিন্ডার গ্যাসের যে সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে, তার মূল দায় বেসরকারি আমদানিকারক ও বোতলজাতকারী কোম্পানিগুলোর।

তারা আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজ ভাড়া বাড়ার কারণে চাহিদার তুলনায় ৫০ শতাংশের কম গ্যাস সরবরাহ করছে। বিইআরসির নির্ধারিত দাম ১,৮৩৭ টাকা হলেও কোম্পানিগুলো ডিলার পর্যায়ে সেই রেটে গ্যাস দিচ্ছে না।

আমাদের স্থানীয় ডিলার বা খুচরা ব্যবসায়ীদের এখানে হাত বাঁধা। জেলা প্রশাসন বা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর শুধু মাঠপর্যায়ের ছোট দোকানগুলোতে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করছে, কিন্তু যেখান থেকে মূল কারসাজি হচ্ছে—সেই বড় বড় কোম্পানির ডিপো ও প্ল্যান্টগুলোতে কোনো তদারকি নেই। কেন্দ্রীয়ভাবে আমদানিকারকদের বাধ্য না করলে এবং সরকার নিজ উদ্যোগে এলপিজি আমদানি না বাড়ালে শুধু মাঠপর্যায়ে অভিযান চালিয়ে এই অরাজকতা বন্ধ করা সম্ভব নয়।
 
উল্লেখ্য গত ২০২১ সালে আদালত বিইআরসিকে গণশুনানি করে এলপিজির দাম নির্ধারণের আদেশ দিয়েছিল। সেই থেকে প্রত্যক মাসে তারা  ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রির জন্য তরলীকৃত সিলিন্ডার গ্যাসের দাম নির্ধারন করে দেন। তবে সেই দামে  সাধারনত গ্যাস মেলেনা কখনই।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/188503