তওবার নামাজের ফজিলত, নিয়ত ও নিয়ম
রাসুলুল্লাহর (সা.) একটি বরকতময় সুন্নত তওবার নামাজ। হজরত আনাস ইবনে মালিকের (রা.) সূত্রে বর্ণিত একটি হাদিসে নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, প্রতিটি আদম সন্তানই বারবার ভুল করে। আর এই ভুলকারী মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে সেরা ও ভালো মানুষ হলো সেই ব্যক্তি, যে ভুলের পর আল্লাহর দরবারে তওবা করে। (সুনানে ইবনে মাজাহ)
তওবা কাকে বলে?
তওবা শব্দের মূল অর্থ হলো ফিরে আসা এবং প্রত্যাবর্তন করা। শয়তানের প্ররোচনায় কিংবা নিজের প্রবৃত্তির তাড়নায় কোনো মানুষ যদি আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে, এরপর তার মধ্যে শুভ বুদ্ধির উদয় হয় এবং সে অপরাধবোধ থেকে অনুতপ্ত হয়ে সেই পাপাচার ত্যাগ করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, মনের এই অনুশোচনাবোধই শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে তওবা হিসেবে বিবেচিত হয়।
তওবার প্রথম স্তরটি শুরু হয় মানুষের অন্তর থেকে। অর্থাৎ, কোনো পাপ বা অন্যায় হয়ে গেলে অন্তর থেকে অনুতপ্ত হওয়া এবং আল্লাহর অনুগত বান্দা হিসেবে ফিরে আসার মানসিকতা ও সংকল্প অন্তরে ধারণ করা হলো তওবার প্রাথমিক ধাপ।
এর পরের ধাপে তওবার বহিঃপ্রকাশ ঘটে মানুষের মুখে। যখন মানুষ অনুতপ্ত হৃদয়ে বলে ওঠে, ‘আস্তাগফিরুল্লাহ ওয়া আতুবু ইলাইহ’ (আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হচ্ছি)।
আর তওবার চূড়ান্ত ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ওই পাপ, পাপের পরিবেশ, সুযোগ-উপকরণ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নেওয়া। মানুষ যখন নিজেকে পাপকর্ম থেকে পুরোপুরি দূরে সরিয়ে আনে এবং নিজের পরিবেশকে পরিবর্তন করে ফেলে, তখন তার তওবা পূর্ণতা পায়।
যেহেতু প্রতিটি মানুষের দ্বারাই কম-বেশি ভুল ও অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে, তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা প্রতিটি ইমানদার বান্দাকে লক্ষ্য করে একটি সার্বজনীন নির্দেশ প্রদান করেছেন। কোরআন মাজিদে এরশাদ হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর দিকে ধাবিত হও, আল্লাহর কাছে তওবা করো; যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা আন-নুর: ৩১)
অন্য এক হাদিসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি গুনাহের পর খাঁটি মনে তওবা করে ফিরে আসে, তার অবস্থা এমন হয়ে যায় যেন সে কোনো গুনাহই করেনি। (সুনানে ইবনে মাজাহ)
এর অর্থ হলো, আল্লাহর দরবারে যদি কোনো বান্দার তওবা কবুল হয়ে যায় এবং তওবা যদি তওবার শর্ত পূরণ করে আদায় করা হয়, তবে তা বান্দাকে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ করে দেয়।
তওবার নামাজের নিয়ত ও নিয়ম
তওবা নিবেদনের যতগুলো মাধ্যম হতে পারে, তার মধ্যে সবচেয়ে নিখুঁত, সুন্দর ও উন্নত মাধ্যম হলো নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা। অর্থাৎ, শয়তানের প্ররোচনায় বা নফসের তাড়নায় কোনো গুনাহ, বড় অপরাধ বা অন্যায় সংঘটিত হয়ে গেলে অলসতা না করে উত্তম রূপে অজু সম্পাদন করা। এরপর নামাজের জন্য দাঁড়িয়ে নিয়ত করা অর্থাৎ মনে মনে বলা: হে আল্লাহ! আমি আপনার ক্ষমা পেতে ও গুনাহ থেকে মুক্তি পেতে দুই/চার রাকাত তওবার নামাজের নিয়ত করছি।
তারপর কমপক্ষে দুই রাকাত (কিংবা সামর্থ্য অনুযায়ী তার চেয়ে বেশি) নামাজ আদায় করা।
নামাজ শেষ করে মহান আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা, চোখের পানি ফেলে অনুতপ্ত হওয়া, অপরাধের কথা স্বীকার করা এবং এই মর্মে সুদৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যে, ‘হে আল্লাহ, আমি আর কখনো এই পাপে ফিরে যাব না।’
নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে ফিরে আসার এই আত্মনিবেদনকেই মূলত তওবার নামাজ বলা হয়।
তওবার নামাজ নবীজির (সা.) গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত
আমাদের সমাজে অন্যান্য অনেক সুন্নাহর মতোই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই আমলটিও আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। এ বিষয়ে সুনানে তিরমিজিতে আমিরুল মুমিনিন হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) থেকে একটি সুপ্রসিদ্ধ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলতে শুনেছি, কোনো মুসলমানের দ্বারা যদি কোনো পাপ সংঘটিত হয়ে যায়, আর সে দাঁড়িয়ে অজু করে নামাজ আদায় করে এবং এরপর আল্লাহর কাছে নিজের কৃত অপরাধের জন্য কায়মনোবাক্যে ইস্তিগফার ও ক্ষমা প্রার্থনা করে, তবে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অবশ্যই তাকে ক্ষমা করে দেন। (সুনানে তিরমিজি)
প্রায় একই ধরনের বর্ণনা মুসনাদে আহমাদে হজরত আবু দারদা (রা.) সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তিনিও নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, কোনো বান্দা যদি অপরাধের পর দুই রাকাত নামাজ আদায় করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, তবে আল্লাহ তাআলা তার সেই গুনাহ মাফ করে দেন। (মুসনাদে আহমাদ)
বিখ্যাত মুহাদ্দিস মোল্লা আলী ক্বারী (রহ.) তাঁর ‘মিরকাতুল মাফাতিহ’ গ্রন্থে ইমাম গাজ্জালি (রহ.) থেকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন, তওবার নামাজ আদায় করতে হবে নিভৃত ও নির্জন স্থানে। যেখানে মানুষের সমাগম নেই, এমন একাকী পরিবেশে মহান আল্লাহকে স্মরণ করে অত্যন্ত বিনয়, নম্রতা ও খুশু-খুজুর সাথে নামাজ আদায় করতে হবে।
নামাজ আদায় শেষে কায়মনোবাক্যে আল্লাহর দরবারে ইস্তিগফার করতে হবে। চোখের পানি ফেলে, আকুল আকুতি জানিয়ে, নিজ অপরাধের কথা স্বীকার করে অনুতপ্ত হৃদয়ে নিজেকে ধিক্কার দিতে হবে। এবং পুনরায় সেই অন্যায়ের পথে পা না বাড়ানোর সুদৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে।
বান্দা যত বেশি আন্তরিকতা, শ্রম ও গুণগত মান বজায় রেখে একাগ্রচিত্তে আল্লাহর সমীপে তওবা নিবেদন করবে, সেই তওবা তত বেশি স্থায়ী ও টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
আমরা অনেকেই প্রতিনিয়ত অভিযোগ করে থাকি যে, ‘আমরা তওবা করি ঠিকই, কিন্তু তওবার ওপর স্থির থাকতে পারি না। তওবা করার কিছুদিন পর আবারও পাপ হয়ে যায়, আবারও তওবা করি, আবারও ভুল করি।’ তওবার নামাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ সুন্নতের অনুসরণ ও আন্তরিক অনুশীলনের মাধ্যমে আমরা এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে পারি।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/188495