সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ ব্যর্থ হচ্ছে কেন?
সড়কে নিরাপত্তাহীনতা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা। সড়ক দুর্ঘটনা দেশে এক গুরুতর জাতীয় সমস্যায় রূপ নিয়েছে। দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল ও বাড়ছে পঙ্গুত্ববরণ করা মানুষের সংখ্যা।প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা, ঝরছে প্রাণ, মানুষ হারাচ্ছে প্রিয়জনকে ।এই লেখাটা যখন লিখছি তখনো হয়ত দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। একটি সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই পালটে দিচ্ছে একজন মানুষের সাজানো গোছানো জীবনের গতিপথ।
সন্তান হারিয়ে কেউ হচ্ছে নিঃস্ব, কেউ বাবা মা কে হারিয়ে হচ্ছে এতিম, স্বামীকে হারিয়ে কেউবা হচ্ছে বিধবা। শুধু তাই নয়, পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবার হচ্ছে দিশেহারা, তাঁদের ভবিষ্যৎ জীবন হচ্ছে অনিশ্চিত, অন্ধকারে ঘেরা; প্রিয়জন হারানোর ব্যথা বয়ে বেড়াতে হচ্ছে সারা জীবন। সড়ক দুর্ঘটনায় কেবল একটি ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে না, মৃত্যু ঘটে একটি স্বপ্নের, একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান বলছে, দেশে মোট সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪,২৩৩টি, নিহত মানুষের সংখ্যা ৫,২৪৬ জন, আহত মানুষের সংখ্যা ৭,৫৪৪ জন।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে অনেক সভা সমাবেশ, র্যালি ,সেমিনার সিম্পোজিয়াম করা হচ্ছে, তবুও কমছে কি এই সড়ক দুর্ঘটনা ? তারপরেও সড়কে প্রাণ ঝরছেই কিন্তু কেন? প্রথমত আমরা এখনো প্রশিক্ষিত চালক তৈরি করতে পারিনি, এখনো অদক্ষ চালকের হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং, যার ফলে যা হবার তাই হচ্ছে, অনেক সময় ড্রাইভারের জায়গায় হেলপার চালাচ্ছে গাড়ি, ফলে ঘটছে দুর্ঘটনা, ঝরছে প্রাণ, এই খাতে দক্ষ চালক তৈরিতে মালিক সমিতি, সরকার কে যৌথ উদ্যোগ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত যে বিষয়টি হলো, এখনো সড়কে অবাধে ফিটনেস বিহীন গাড়ি চলছে, ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি রাস্তায় নামছে, যা রাস্তার মাঝে চলন্ত অবস্থায় নষ্ট হয়ে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে বা তীব্র যানজট সৃষ্টি করছে; তৃতীয়ত, অতিরিক্ত গতি এবং অবৈধ ওভারটেকিংয়ের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে, অনেক সময় চালক সময় বাঁচাতে নিয়ন্ত্রণহীন গতিতে গাড়ি চালিয়ে থাকে এবং আগে পিছে কোন গাড়ি আসছে কিনা তা না দেখেই একটি গাড়ি আরেকটি গাড়িকে ওভারটেকিং করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পতিত হচ্ছে। চতুর্থত, অনেক সময় চালক একাধিক ট্রিপ গাড়ি চালাতে গিয়ে বিশ্রাম না নিয়ে গাড়ি চালিয়ে থাকে এবং অনেক সময় শারীরিক অসুস্থ অবস্থায় গাড়ি চালায়, যার ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে; পঞ্চমত, চালকদের সচেতনতার অভাব; অনেক সময় কানে হেডফোন লাগিয়ে বা ফোনে কথা বলা অবস্থায় বা মাদক গ্রহণ করে গাড়ি চালাচ্ছে, যার ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে। পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব দুর্ঘটনার বড়ো অংশ সচেতনতা, জবাবদিহি এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। এর জন্য চালকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, চুক্তিভিত্তিক মজুরি পদ্ধতির পরিবর্তে স্থায়ী বেতন ব্যবস্থা চালু, ট্র্যাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং সড়কে আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা স্থাপন করা জরুরি।
অন্যদিকে কঠোর আইন, যেমন : সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ প্রণয়ন করা হলেও পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সমিতির চাপের মুখে অনেক সময় শাস্তি বা আইন প্রয়োগে শিথিলতা দেখানো হয়। যার ফলে চালকদের মাঝে আইন না মানার প্রবণতা বাড়ছে। তাই নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো যাচ্ছে না। চালকদের বেপরোয়া মনোভাব ও অদক্ষতার কারণে বারবার তা ব্যর্থ হচ্ছে। ঘটছে একের পর এক দুর্ঘটনা। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে মালিক, পরিবহন কোম্পানি, সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। তাই যে-কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়নে দরকার ইতিবাচক মানসিকতা ও সমন্বিত পদক্ষেপ। দেশে এ মুহূর্তে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে পরিবহন মালিক, শ্রমিকদের পাশাপাশি যাত্রীদের সচেতনতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ করা জরুরি । সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে স্বতন্ত্র ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠন করা জরুরি, যারা পরিবহন ব্যবস্থার নিয়মতান্ত্রিকতার ধারাবাহিকতা ও আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করবে এবং যাত্রীসেবার মান উন্নত করবে।
লেখকঃ প্রকৌশলী ও কলামিস্ট।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/188275