সব যন্ত্রের পাওয়ার বাটনে একই চিহ্ন থাকে কেন?
স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, টেলিভিশন কিংবা এসির রিমোট প্রায় সব ধরনের ইলেকট্রনিক যন্ত্রেই পাওয়ার বাটনে একটি পরিচিত চিহ্ন দেখা যায়। বৃত্তের ওপরের দিকে ছোট ফাঁক, আর তার মাঝখানে একটি খাড়া দাগ। বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও দেশের যন্ত্রে একই ধরনের চিহ্ন ব্যবহারের পেছনে রয়েছে প্রযুক্তির ইতিহাস এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড তৈরির গল্প।
পাওয়ার বাটনের চিহ্নের শুরু যেভাবে
এই চিহ্নের ধারণার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাইনারি সংখ্যা পদ্ধতি। ইলেকট্রনিকস ও কম্পিউটিংয়ে বাইনারি পদ্ধতিতে ‘১’ এবং ‘০’ ব্যবহার করা হয়। সাধারণভাবে সুইচের ক্ষেত্রে ‘১’ চালু এবং ‘০’ বন্ধ অবস্থা বোঝাতে ব্যবহৃত হতে থাকে। সংখ্যাভিত্তিক এই সংকেতের সুবিধা হলো, তা বোঝার জন্য নির্দিষ্ট কোনো ভাষা জানা প্রয়োজন হয় না।
পরবর্তী সময়ে বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রে সুইচের চিহ্নগুলোকে আরও সহজবোধ্য ও একরকম করার প্রয়োজন দেখা দেয়। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ইন্টারন্যাশনাল ইলেকট্রোটেকনিক্যাল কমিশন (আইইসি)। সংস্থাটি বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণ করে।
‘১’ ও ‘০’ মিলেই পরিচিত চিহ্ন
পাওয়ার বাটনের বহুল পরিচিত চিহ্নটির পেছনে রয়েছে চালু ও বন্ধ অবস্থার ধারণা। একটি বৃত্তের সঙ্গে খাড়া দাগ যুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে এই প্রতীক। এখানে বৃত্তটি ‘০’ এবং দাগটি ‘১’-এর ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত।
১৯৭৩ সালে আইইসি এই ধরনের প্রতীককে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অন্তর্ভুক্ত করে। তবে চিহ্নটির অর্থ শুধু যন্ত্র চালু বা বন্ধ করা নয়; এর ব্যবহার যন্ত্রের নকশা ও সুইচের কার্যপদ্ধতির ওপরও নির্ভর করতে পারে। প্রচলিত ব্যাখ্যায় এটি চালু ও স্ট্যান্ডবাই অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত।
স্ট্যান্ডবাই বলতে এমন একটি অবস্থা বোঝায়, যখন যন্ত্রটি পুরোপুরি কাজ করছে না, কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু কাজের জন্য প্রস্তুত থাকতে পারে। ফলে যন্ত্রের ধরন অনুযায়ী একই বোতাম চাপলে সেটি চালু হতে পারে, আবার চালু থাকা অবস্থায় চাপলে স্ট্যান্ডবাই মোডেও যেতে পারে।
পাওয়ার বাটনের সব চিহ্নের অর্থ কি এক?
দেখতে কাছাকাছি হলেও পাওয়ার সুইচে ব্যবহৃত সব চিহ্নের অর্থ এক নয়। সাধারণভাবে এগুলোর অর্থ হলো-
‘I’ চিহ্ন: যন্ত্র চালু বা বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু থাকার অবস্থা বোঝায়।
‘O’ চিহ্ন: যন্ত্র বন্ধ বা বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন থাকার অবস্থা বোঝায়।
বৃত্তের সঙ্গে খাড়া দাগ: অনেক ইলেকট্রনিক যন্ত্রে এটি পাওয়ার বাটনের পরিচিত প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে এটি চাপলে যন্ত্র চালু হবে, বন্ধ হবে নাকি স্ট্যান্ডবাই মোডে যাবে, তা যন্ত্রের নকশার ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ প্রতীকগুলো কাছাকাছি হলেও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে তাদের কাজ আলাদা হতে পারে।
পাওয়ার বাটন চাপলেও বিদ্যুৎ পুরোপুরি বন্ধ হয় না কেন?
আধুনিক স্মার্টফোন, টেলিভিশন ও কম্পিউটারে পাওয়ার বাটন সব সময় সরাসরি বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে না। অনেক ক্ষেত্রে এটি একটি নিয়ন্ত্রণ সংকেত হিসেবে কাজ করে। বাটন চাপলে যন্ত্রের সফটওয়্যার বা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ঠিক করে, সেটি চালু থাকবে, ঘুমন্ত অবস্থায় যাবে নাকি বন্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে।
এ কারণেই টেলিভিশন বন্ধ করার পরও অনেক সময় লাল নির্দেশক আলো জ্বলতে দেখা যায়। এর অর্থ, টেলিভিশনটি স্ট্যান্ডবাই অবস্থায় রয়েছে এবং বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। একইভাবে কম্পিউটার বা ল্যাপটপের স্লিপ মোডেও কিছু অংশ সক্রিয় থাকতে পারে। তবে সব যন্ত্রের ক্ষেত্রে বিষয়টি এক নয়। কোনো কোনো সুইচ সরাসরি বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে, আবার কোনো কোনো বাটন কেবল যন্ত্রের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে।
ভাষা না জেনেও চেনা যায় পাওয়ার বাটন
পাওয়ার বাটনের পরিচিত প্রতীকটির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি ভাষানিরপেক্ষ। ব্যবহারকারী বাংলা, ইংরেজি কিংবা অন্য যে ভাষাই জানুন না কেন, প্রতীকটি দেখেই সাধারণত বুঝতে পারেন কোথায় যন্ত্র চালু বা বন্ধ করার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের কারণে বিভিন্ন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রে একই ধরনের প্রতীক ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে। এতে ব্যবহারকারীর সুবিধা হয় এবং বিভিন্ন দেশের পণ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিভ্রান্তি কমে। পাওয়ার বাটনের ছোট্ট এই চিহ্ন কেবল একটি নকশা নয়; এটি প্রযুক্তির জগতে সহজবোধ্য ও সর্বজনীন যোগাযোগের একটি উদাহরণ।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/188211