যে ৩ আমলের সওয়াব পেতে থাকবেন মৃত্যুর পরও

যে ৩ আমলের সওয়াব পেতে থাকবেন মৃত্যুর পরও

মৃত্যুর আগে তিনটি কাজ করে যেতে পারলে মৃত্যুর পরও আমলনামায় ও সওয়াবের অ্যাকাউন্টে সওয়াব যোগ হতে থাকে। মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সমস্ত আমলের দুয়ার বন্ধ হয়ে যায়, কেবল এই তিনটি আমল ছাড়া।

১. উপকারী ইলম

প্রথমটি হলো উপকারী জ্ঞান বা ইলম রেখে যাওয়া। কাউকে আপনি কোনো ভালো কিছু শেখালেন, শিক্ষা দিতে সহযোগিতা করলেন বা উদ্যোগী হলেন; সে আপনার শিক্ষা থেকে শিক্ষিত হয়ে, আপনার ইলম থেকে উপকৃত হয়ে নিজের জীবনকে আলোকিত করল এবং অন্যদেরকেও আলোকিত করল। এই ধারা যতদিন চলতে থাকবে, এর প্রতিষ্ঠাতা বা ফাউন্ডার হিসেবে আল্লাহ তাআলা আপনার আমলনামায় সওয়াব দিতে থাকবেন। এটি জাগতিক কোনো উপকারী শিক্ষা হতে পারে, আবার দ্বীনি ও ধর্মীয় শিক্ষাও হতে পারে। আপনি একটি দোয়া বা আমল জানলেন এবং সেটি আরেকজনকে শেখালেন, আর তিনি শেখালেন অন্যজনকে এই পরম্পরা যতদিন চলতে থাকবে, ততদিন মৃত্যুর পরও মানুষের আমলনামায় সওয়াব যুক্ত হতে থাকবে।

২. সদকায়ে জারিয়া

দ্বিতীয় আমলটি হলো সদকায়ে জারিয়া। সদকায়ে জারিয়া বলা হয় ওই দানকে, যে দানের উপকারিতা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে। আমরা সাধারণত এককালীন বা ওয়ান টাইম দানে অভ্যস্ত, অথচ দানের ক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য রাখা উচিত যেন দানটি দীর্ঘমেয়াদি হয়। ধরুন, আপনি একজন গরিবকে কিছু টাকা দিয়ে দিলেন; এর চাইতে উত্তম হলো তার জন্য এমন একটা স্থায়ী ব্যবস্থা করে দেওয়া, যেখান থেকে সে দীর্ঘমেয়াদে উপকার পেতে থাকে। কিংবা আপনি একটা বৃক্ষরোপণ করলেন, সেটি আপনার বাড়ির ছাদে, বারান্দায় বা যে কোনো জায়গায় হতে পারে। আপনি একটি গাছ লাগালেন, যার অক্সিজেন ও ফল-ফসল মানুষ এবং পশুপাখি ভোগ করবে। নবী করিম (সা.) সদকায়ে জারিয়া হিসেবে গাছ লাগাতে বলেছেন। তিনি বলেছেন, কোনো মুসলমান যদি কোনো গাছ লাগায় বা ফসল ফলায় এবং সেখান থেকে কোনো মানুষ, পশুপাখি বা কীট-পতঙ্গ খায়, তবে সেটির সওয়াব সে পেতেই থাকবে।

আমি মরে যাব, কিন্তু আমার লাগানো গাছের সওয়াব আমার আমলনামায় যুক্ত হতে থাকবে। এভাবে দুই-চার শ গাছ বা এর বেশি লাগিয়ে যেতে পারলে এবং সেখান থেকে কিছু গাছ টিকে থাকলে যতদিন মানুষ অক্সিজেন, ছায়া ও ফল পাবে, মানুষের মৃত্যুর পরও সেই সওয়াব অব্যাহত থাকবে। একইভাবে একটি মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল বা হাসপাতাল নির্মাণ করা কিংবা সাধ্যমতো যে কোনো জনকল্যাণমূলক কাজ করা মৃত্যুপরবর্তী জীবনে অনেক বেশি উপকারে আসে।

৩. নেক সন্তান

তৃতীয় ও সবচেয়ে বড় আমল হলো নেক সন্তান গড়ে তোলা। আমাদের সন্তানদের যদি আমরা আল্লাহমুখী করে যেতে পারি, আল্লাহর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পারি এবং কোরআন-হাদিসের সাথে তাদের সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি, তবে এই সন্তান যখন দোয়া করবে, তা মৃত্যুপরবর্তী জীবনে ভীষণ উপকারে আসবে। নবী করিম (সা.) বলেছেন, জান্নাতে কোনো ব্যক্তির মর্যাদা হঠাৎ করে অনেক বাড়িয়ে দেওয়া হলে তিনি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করবেন, ‘হে আল্লাহ, আমি তো এখন আমল করে নিজের মর্যাদা বাড়িয়ে নেওয়ার কোনো সুযোগ রাখি না, তবে আমাকে এই উচ্চ মর্তবা কেন দেওয়া হলো?’ তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, ‘তুমি দুনিয়ায় যে সন্তান রেখে এসেছ, তার দোয়ার বরকতে তোমার এই মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে।’

আজকাল আমরা মৃত আত্মীয়স্বজনের জন্য অন্যদের কাছে দোয়া চেয়ে থাকি; অন্যদের কাছে দোয়া চাওয়া নিষেধ নয়, তবে সন্তান ও পরিবারের সদস্যরা মৃত মা-বাবার জন্য যে নিষ্ঠা, ঐকান্তিকতা ও আন্তরিকতার সাথে দোয়া করবেন, তা অন্য দশজনের দোয়ায় কখনোই পাওয়া যাবে না।

মৃত আত্মীয়দের জন্য আমাদের করণীয়

আমরা যাদের হারিয়েছি, তাদের মৃত্যুর পর জীবিতরা তাদের জন্য কী করতে পারি? সবার আগে এবং সবচেয়ে বড় করণীয় হলো তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা। মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিত ব্যক্তির দোয়া অত্যন্ত কার্যকরী। আমরা তাদের জন্য কেবল দোয়া করতে পারি। এই দোয়া এত বেশি ইফেক্টিভ যে, আপনার মৃত মা-বাবা বা আত্মীয়স্বজনের জন্য আপনি যদি একান্তে চোখের পানি ফেলে আল্লাহর সাথে কথা বলেন এবং বলেন, ‘হে আল্লাহ, আমার মা-বাবাকে ক্ষমা করে দিন, তাদের ভুলত্রুটিগুলো মাফ করে দিন,’ তবে আল্লাহ তাআলার কাছে এই নিবেদন অত্যন্ত প্রিয় হয়। দোয়ার জন্য কোনো আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন নেই; আপনি কর্মক্ষেত্রে বা যে কোনো অবস্থায় নিভৃতে মনে মনে কিংবা হাত তুলে বা ওজু ছাড়াও এই দোয়া করতে পারেন।

দ্বিতীয় আমল হলো মৃত ব্যক্তির তরফ থেকে দান করা। আপনার মা-বাবার পক্ষ থেকে দান করার সময় কেবল মনে এই নিয়ত রাখবেন যে, এই দানের সওয়াব যেন আল্লাহ তাআলা মৃত ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে পৌঁছে দেন।

নবী করিমের (সা.) যুগে এক সাহাবি এসে বলেছিলেন যে তার একটি কূপ রয়েছে এবং তিনি তার মায়ের তরফ থেকে সেটি সদকা করতে চান; নবীজি (সা.) তাকে তা করার অনুমতি দিয়েছিলেন। তাই আমাদের মৃত মা-বাবার জন্য দানের একটি অংশ সবসময় রাখা উচিত এবং তাদের তরফ থেকে তা সদকা করা উচিত।

তৃতীয় আমল হলো মৃত ব্যক্তির তরফ থেকে হজ ও ওমরাহ আদায় করা। আমাদের কোনো প্রিয়জন মারা গেলে, নিজের ফরজ হজ আদায় করা থাকলে তার পক্ষ থেকে হজ বা ওমরাহ করা যায়। শুধু নিয়ত থাকতে হবে যে এই ইবাদতের সওয়াব মৃত ব্যক্তির জন্য। সাহাবিরা নবি করিম (সা.)-এর কাছে তাঁদের মৃত মা-বাবার পক্ষ থেকে হজ করার বিষয়ে জানতে চাইলে নবীজি তা করার অনুমতি দিয়েছিলেন।

চতুর্থত, মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে রোজা রাখা যায়। মৃত ব্যক্তি যদি কোনো ফরজ রোজা বা মান্নতের রোজা না রেখে মারা যান, তবে তার পক্ষ থেকে সেই রোজাগুলো রেখে দেওয়া যেতে পারে। সহিহ বুখারি ও মুসলিমের হাদিস দ্বারা এটি প্রমাণিত যে, মৃত ব্যক্তির তরফ থেকে রোজা রাখলে তা তার উপকারে আসে। নামাজের সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে পৌঁছানো নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও কোরবানির বিষয়টি বিভিন্ন হাদিস থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, আমরা নিজেদের কোরবানির পাশাপাশি মৃত আত্মীয়স্বজনের পক্ষ থেকেও কোরবানি করতে পারি। এই আমলগুলো আমরা মৃত ব্যক্তিদের উপকারের জন্য নিয়মিত করতে পারি।

(শায়খ আহমাদুল্লাহর বয়ান অবলম্বনে)

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/187979