বগুড়ার শাজাহানপুরের রামকৃষ্ণ আশ্রমে অনুষ্ঠিত হলো কুমারী পূজা
শাজাহানপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি : পঞ্চমবারের মতো বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার গণ্ডগ্রামে অবস্থিত বগুড়া শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম প্রাঙ্গণে দেবীজ্ঞানে এক কুমারীকে পূজার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে কুমারী পূজা।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) শারদীয় দুর্গাপূজার মহাষ্টমীতে সকাল ৯টা থেকে সোয়া ১০টা পর্যন্ত বৈদিক শাস্ত্রমতে এ পূজা পরিচালনা করেন পুরোহিত বাসুদেব ব্যানার্জি।
কুমারী পূজা উপলক্ষে নির্জলা উপবাস থেকে হিন্দু নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর ও বৃদ্ধরা দেবীর উদ্দেশে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করেন। শেষে বিশ্ববাসীর শান্তি এবং দেশ, জাতি ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে দুর্গাদেবীর আশীর্বাদ কামনা করে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়।
কুমারী পূজা দেখতে বগুড়া শহরসহ বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রায় দুই হাজার ভক্ত শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম চত্বরে সমবেত হন। স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভক্তদের উপচে পড়া ভিড় ছিল লক্ষণীয়। ঢাকঢোলের বাদ্য, শঙ্খ ও উলুধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে আশ্রম চত্বর।
মণ্ডপের পুরোহিত বাসুদেব ব্যানার্জি জানান, কুমারী বালিকার মধ্যে বিশুদ্ধ নারীর রূপ বেশি প্রকাশ পায়। তাই কুমারীকে দেবীরূপে কল্পনা করে দেবীজ্ঞানে পূজা করা হয়। কুমারী পূজার সূচনা সম্পর্কে তিনি বলেন, শাস্ত্রমতে কুমারী পূজার উদ্ভব হয় বানাসুরকে হত্যার মধ্য দিয়ে। কোলাসুর নামক অসুর একসময় স্বর্গ-মর্ত্য অধিকার করে নেয়। কোলাসুর স্বর্গ-মর্ত্য অধিকার করায় বিপন্ন দেবগণ মহাকালীর শরণাপন্ন হন। দেবগণের আবেদনে সাড়া দিয়ে দেবী মানবকন্যারূপে জন্মগ্রহণ করেন এবং কুমারী অবস্থায় কোলাসুরকে হত্যা করেন। এরপর থেকেই মর্ত্যে কুমারী পূজার প্রচলন শুরু হয়। প্রতি বছর দুর্গাদেবীর মহাষ্টমী পূজাশেষে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
বগুড়া শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রমের সভাপতি ডা. বিপ্লব কুমার বর্মণ ও সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট আতিয়া কান্ত বর্মণ জানান, ২০১৮ সালে বগুড়া শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০২২ সাল থেকে আশ্রম চত্বরে দুর্গাপূজার সূচনা করে আশ্রম কমিটি। একই সঙ্গে শুরু হয় কুমারী পূজাও।
২০২২ সালে দেবীরূপে পূজিত করা হয় বগুড়া শহরের জলেশ্বরীতলা এলাকার জিমি কুমার দাস ও সরস্বতী সাহা দম্পতির কুমারী কন্যা শুভশ্রী দাসকে। এরপর ২০২৩ সালে বগুড়া শহরের সেউজগাড়ি এলাকার শান্তনু ব্যানার্জি ও মলি চক্রবর্তী দম্পতির কুমারী কন্যা শ্রেয়া ব্যানার্জি, ২০২৪ সালে বগুড়া শহরের খান্দার এলাকার চিকিৎসক মিল্টন কুমার সাহা ও বিথি রানী সাহা দম্পতির কুমারী কন্যা নিভৃত মন্দির সাহা এবং ২০২৫ সালে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার চিকিৎসক তন্ময় বর্মন ও প্রিয়াঙ্কা সাহা দম্পতির কুমারী কন্যা তেজশ্রী বর্মণ পঙতি বর্মণকে দেবীরূপে পূজিত করা হয়।
সেই ধারাবাহিকতায় এবার ২০২৬ সালে বগুড়া শহরের নারুলী এলাকার বাসিন্দা প্রকৌশলী রতন সাহা ও প্রিয়াঙ্কা সাহা দম্পতির ছয় বছর বয়সী কুমারী কন্যা রূপকথা সাহাকে দেবীরূপে পূজা করা হয়। রূপকথা বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের কেজি শ্রেণির শিক্ষার্থী।
বগুড়া রামকৃষ্ণ আশ্রম কমিটির নেতৃবৃন্দ জানান, আশ্রম চত্বরে কুমারী পূজার এ আয়োজন ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। নিজ শিশু কন্যা দেবীরূপে পূজিত হওয়ার অনুভূতি জানাতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন রূপকথা সাহার বাবা-মা। তাঁরা বলেন, তাঁদের মেয়ে দেবীরূপে পূজিত হয়েছে, এটি অত্যন্ত সৌভাগ্যের বিষয়। এ আনন্দ শুধু হৃদয় দিয়েই অনুভব করা যায়, ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
কুমারী পূজার সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন ডা. বিপ্লব কুমার বর্মণ, অ্যাডভোকেট আতিয়া কান্ত বর্মণ, ধীরেন চন্দ্র রায়, সত্যেন্দ্র নাথ মোদক, শান্তিপ্রিয় রায়, নিবারণ চন্দ্র দাস, দেবাশীষ লাহিড়ী, প্রদীপ চন্দ্র সরকার, উৎপল কুমার দাস, রতন বিশ্বাস, বিশ্বনাথ সরকার, অ্যাডভোকেট গগণ চন্দ্র রায় প্রমুখ।
সব মণ্ডপে কুমারী পূজার আয়োজন কেন হয় না, জানতে চাইলে বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন ফ্রন্টের শাজাহানপুর উপজেলা শাখার আহ্বায়ক আচানু মোহন্ত জানান, শাজাহানপুর উপজেলায় এবার ৪৮টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা হচ্ছে। কিন্তু কুমারী পূজা হয়েছে শুধুমাত্র রামকৃষ্ণ আশ্রম চত্বরে স্থাপিত দুর্গামণ্ডপে। কুমারী পূজার জন্য অভিজ্ঞ পুরোহিত এবং কুমারী নির্বাচনের ক্ষেত্রে আগ্রহী পরিবার পাওয়া কঠিন হওয়ায় সব মণ্ডপে কুমারী পূজার আয়োজন করা সম্ভব হয় না।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/187961