‘শান্তি নিবাস’ দিয়ে এআই চলচ্চিত্র নির্মাণে নতুন অধ্যায়

‘শান্তি নিবাস’ দিয়ে এআই চলচ্চিত্র নির্মাণে নতুন অধ্যায়

বিনোদন ও প্রযুক্তি ডেস্ক : বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) প্রযুক্তি যখন সৃজনশীল শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও ডিজিটাল বিনোদন জগতে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে সামনে এসেছেন তরুণ উদ্যোক্তা, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও নির্মাতা তানজিল আহমেদ।

তার প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি ও সৃজনশীল প্রতিষ্ঠান Branta Tech-এর চলচ্চিত্র নির্মাণ উদ্যোগ Branta Films-এর ব্যানারে নির্মিত হয়েছে এআই-নির্ভর বাংলা ওয়েব সিরিজ ‘শান্তি নিবাস’। প্রচলিত শুটিং পদ্ধতির বাইরে গিয়ে আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি, সৃজনশীল পরিকল্পনা এবং ডিজিটাল চলচ্চিত্র নির্মাণের বিভিন্ন কৌশলকে একত্র করে তৈরি করা হয়েছে এই গল্পনির্ভর সিরিজ। শুধু প্রযুক্তির সক্ষমতা প্রদর্শন নয়, বরং ভালোবাসা, হাস্যরস, সামাজিক সম্পর্ক, মানুষের আবেগ এবং তরুণ প্রজন্মের বাস্তব জীবনের গল্পকে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করাই এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে নিজস্ব চলচ্চিত্র নির্মাণের যাত্রা : তরুণ বয়স থেকেই প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও সৃজনশীল কাজের প্রতি আগ্রহী তানজিল আহমেদ। নিজের প্রতিষ্ঠিত Branta Tech-এর মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিজ্ঞাপনচিত্র, ব্র্যান্ড ফিল্ম, ডিজিটাল কনটেন্ট, ব্র্যান্ডিং এবং সফটওয়্যার প্রযুক্তি নিয়ে বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করে আসছেন তিনি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সৃজনশীল প্রকল্পের অভিজ্ঞতাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন তানজিল। তার ভাষ্যমতে, এর আগে নেটফ্লিক্সে ফিচার হওয়া একজন পরিচালকের সঙ্গে সহযোগিতামূলক একটি প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল তার। সেই অভিজ্ঞতা থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের গল্প বলার কৌশল, ভিজ্যুয়াল পরিকল্পনা এবং প্রযুক্তির সৃজনশীল ব্যবহার নিয়ে আরও গভীরভাবে কাজ করার আগ্রহ তৈরি হয়।

তবে এবার অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পে সহযোগী হিসেবে নয়, বরং নিজের প্রতিষ্ঠান, নিজস্ব নির্মাতা দল এবং নিজস্ব পরিচালনায় একটি পূর্ণাঙ্গ গল্প দর্শকদের সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। সেই উদ্যোগের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে এসেছে ‘শান্তি নিবাস’। একটি ভবন, অসংখ্য চরিত্র, ভালোবাসা ও জীবনের গল্প ‘শান্তি নিবাস’ কেবল একটি আবাসিক ভবনের নাম নয়। এটি এমন এক কাল্পনিক জগৎ, যেখানে একই ছাদের নিচে বসবাসকারী মানুষের হাসি-কান্না, স্বপ্ন, আবেগ, ভুল বোঝাবুঝি, বন্ধুত্ব ও সম্পর্কের গল্প একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।

এই গল্পে রয়েছে হঠাৎ চোখে চোখ পড়া থেকে জন্ম নেওয়া ভালোবাসা, প্রতিবেশীদের মজার ঘটনা, একে অপরের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং সমাজে একসঙ্গে বসবাসের সৌন্দর্য। পাশাপাশি বর্তমান সময়ের তরুণ উদ্যোক্তাদের সংগ্রাম, স্টার্টআপ গড়ে তোলার স্বপ্ন, ব্যর্থতা কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট ক্রিয়েটর সংস্কৃতির বিভিন্ন দিকও তুলে ধরা হয়েছে। কখনো হাস্যরস, কখনো আবেগ, আবার কখনো জীবনের বাস্তবতার মাধ্যমে এগিয়েছে ‘শান্তি নিবাস’-এর গল্প।

নির্মাতাদের লক্ষ্য ছিল, দর্শক যেন প্রযুক্তির উপস্থিতির পাশাপাশি গল্পের চরিত্রগুলোর সঙ্গে নিজেদের পরিচিত জীবনের মিল খুঁজে পান।

পর্দার আড়ালে দীর্ঘ গবেষণা ও নিরলস পরিশ্রম : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও তৈরি করা আর ধারাবাহিক গল্প, চরিত্র ও আবেগ ধরে রেখে একটি ওয়েব সিরিজ নির্মাণ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন চ্যালেঞ্জ। ‘শান্তি নিবাস’ নির্মাণের ক্ষেত্রেও সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে তানজিল আহমেদ ও তার সৃজনশীল দলকে। প্রকল্পটির পেছনে রয়েছে নিবিড় গবেষণা, দীর্ঘ পরিকল্পনা, বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অসংখ্য সৃজনশীল সিদ্ধান্ত। কখনো চরিত্রের চেহারার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, কখনো একটি দৃশ্যের সঙ্গে পরবর্তী দৃশ্যের পরিবেশ মিলিয়ে নেওয়া, আবার কখনো মানুষের স্বাভাবিক অভিব্যক্তি ও আবেগকে বিশ্বাসযোগ্য করে ফুটিয়ে তোলা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

একটি দৃশ্য প্রত্যাশামতো না হলে সেটি সংশোধন, পুনর্নির্মাণ এবং নতুনভাবে পরিকল্পনা করতে হয়েছে। এভাবে গল্পের প্রতিটি অংশকে একটি সমন্বিত নির্মাণে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছে দলটি। গভীর রাত পর্যন্ত কাজ, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই এবং সৃজনশীলতার নতুন নতুন সমাধান খোঁজার মধ্য দিয়েই এগিয়েছে নির্মাণপ্রক্রিয়া। নির্মাতা দলের কাছে এটি ছিল শুধু একটি ওয়েব সিরিজ তৈরির কাজ নয়, বরং নতুন প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে গল্প বলার একটি বাস্তব পরীক্ষা।

প্রযুক্তি নয়, গল্পই প্রধান শক্তি : 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চলচ্চিত্র নির্মাণে নতুন সুযোগ তৈরি করলেও গল্প, পরিচালনা এবং মানুষের সৃজনশীল চিন্তার বিকল্প নয় বলে মনে করেন নির্মাতারা। ‘শান্তি নিবাস’ নির্মাণে তাই শুধু আকর্ষণীয় দৃশ্য তৈরির পরিবর্তে চরিত্রের ব্যক্তিত্ব, পারস্পরিক সম্পর্ক, আবেগ এবং গল্পের ধারাবাহিকতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্মাতাদের মতে, একটি দৃশ্য দেখতে সুন্দর হলেই সেটি ভালো চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে না। সেই দৃশ্যের পেছনে থাকতে হয় গল্প, উদ্দেশ্য ও দর্শকের সঙ্গে সংযোগ তৈরির সক্ষমতা। এই ধারণা থেকেই এই প্রযুক্তিকে একটি সৃজনশীল মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগিয়ে ‘শান্তি নিবাস’ নির্মাণ করা হয়েছে।

Branta Tech থেকে Branta Films : বড় স্বপ্নের নতুন সূচনা : প্রযুক্তি ও সৃজনশীল সেবার প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করা ইৎধহঃধ ঞবপয এবার ইৎধহঃধ ঋরষসং-এর মাধ্যমে চলচ্চিত্র ও বিনোদন কনটেন্ট নির্মাণে নিজেদের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করতে চায়। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে ওয়েব সিরিজ, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, ব্র্যান্ড ফিল্ম, বিজ্ঞাপনচিত্র এবং নতুন ধরনের ডিজিটাল বিনোদনমূলক প্রকল্প তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

তানজিল আহমেদের লক্ষ্য, বাংলাদেশের তরুণদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সৃজনশীল চিন্তাকে কাজে লাগিয়ে এমন একটি নির্মাণ পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে উদ্ভাবনী গল্প আন্তর্জাতিক মানের উপস্থাপনার সুযোগ পাবে।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/187718