হত্যার শিকার হতে পারেন, পুলিশকে আগেই জানিয়েছিলেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান

হত্যার শিকার হতে পারেন, পুলিশকে আগেই জানিয়েছিলেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান

মফস্বল ডেস্ক : নেত্রকোনার সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফকে হত্যা করা হতে পারে—এমন আশঙ্কার কথা জেলা পুলিশের এক মতবিনিময় সভায় তিনি নিজেই প্রকাশ করেছিলেন। গত বছর নভেম্বর মাসে নেত্রকোনার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. তরিকুল ইসলামের যোগদান উপলক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আয়োজিত এক পরিচিতি ও মতবিনিময় সভায় নিজের জীবনশঙ্কার কথা স্পষ্ট তুলে ধরেছিলেন স্থানীয় এই সাংবাদিক।

পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলামের উপস্থিতিতে তিনি তখন স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, সভা চলাকালীন সময়েই বাইরে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা অবস্থান করছে। সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের পর সেই বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই সভায় লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির বলেছিলেন, ‘আমি আপনার এখানে এখন যে বসে আছি, আমার কাছে মেসেজ আসছে—তারা রাস্তায় বসে আছে দুইটা অস্ত্র নিয়ে। একটা নাইন এমএমে পাঁচটা গুলিসহ তারা বসে আছে। আমি যাওয়ার সময় গুলি করবে। যদিও আমি আজকে যাব না।’

তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমি অর্গানাইজড ক্রাইম নিয়ে কাজ করি। এই জেলায় দুর্ধর্ষ ও সশস্ত্র যেসব গ্রুপ আছে, তাদের বিষয়ে আমি নিউজ করে থাকি। মাদক থেকে শুরু করে সব। এই জেলায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হলো দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা। এখানে চোরাচালানের সঙ্গে সংঘবদ্ধ ৮টি গ্রুপ আছে, তারা অস্ত্র বহন করে। ককটেল, বিস্ফোরক, মাদকসহ সব কিছুই করে তারা।’ এসপি’র উদ্দেশে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘এই আসামিদের যদি ধরা না হয়, তবে সবাইকে সাক্ষী রেখে বলছি, হয় আমাকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে, না হয় তাদের চেয়ে বড় সন্ত্রাসি হতে হবে। এই সিদ্ধান্তটা এখন আপনাদের নিতে হবে।’

নিরাপত্তা শঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘উপজাতি শ্বশুরবাড়িতে আমার সন্তান হওয়ার কারণে আমি সেখানে আছি। কিন্তু যেকোনো সময় সেই উপজাতির বাড়িতেও তারা আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে। কালকেও চেষ্টা করেছিল, পারে নাই। এই নিয়ে একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির চেষ্টাও হতে পারে।’

মতবিনিময় সভায় উপস্থিত জেলা পুলিশ প্রধানের কাছে প্রকাশ্যে এমন আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করার পরও শেষ রক্ষা হলো না লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের। তার সেই আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত মর্মান্তিক বাস্তবে পরিণত হলো। বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে জেলার দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের উত্তরাইল এলাকার তেলনজিয়া গ্রামে একটি চায়ের দোকানের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে।

তিনি আইপিটিভি চ্যানেল ‘রূপসী বাংলা’র নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন, যেখানে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে নিয়মিত তথ্যবহুল পোস্ট ও ভিডিও প্রকাশ করতেন।

দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ঘটনার পর থেকেই জড়িত আসামিদের শনাক্তের কাজ চলছে। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, আলামত বিশ্লেষণ ও আলিফের ফেসবুক পেজের পোস্ট—সবকিছু বিবেচনায় রেখেই তদন্ত চালানো হচ্ছে। খুব শিগগিরই জড়িতদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে। এছাড়া নাইন এমএম পিস্তল থেকেই তাকে গুলি করার বিষয়টিও নিশ্চিত করেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ২ মিনিট ৪৮ সেকেন্ডের ভাইরাল হওয়া ভিডিও সম্পর্কে জানতে চাইলে নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার যোগদানের দিন তিনি এই কথাগুলো বলেছিলেন। তখন নভেম্বরে তার ওপর হামলার মামলায় অভিযুক্ত আসামিদের গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তীতে তারা জামিনে মুক্তি পান। সবগুলো বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রেখে তদন্ত চলছে। আশা করছি দ্রুতই আসামিদের গ্রেফতারে সক্ষম হব।’

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/187714