নদী, জীবন ও সভ্যতার বহমানতা
নদীর বেড়ে ওঠা আর মানব জীবনের অগ্রগতির সম্পর্ক অভিন্ন। সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষের সবচেয়ে বড় সঙ্গী ছিল নদী। আর যদি বাংলার মানুষের কথা আসে তবে নদী সত্যিই যেন ধাত্রী রূপে আশ্রয় দিয়েছে। এই আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতা সত্ত্বেও মানুষের জীবন এখনও অবধি নদীর বাঁকে বাঁকে বয়ে চলছে।
নদীর অথৈ গভীরতা, ঢেউয়ের কলরব মানসিক প্রশান্তির অনুষঙ্গ। নদীর পানি, সেই পানিতে বেড়ে ওঠা মাছ বেঁচে থাকার মৌলিক রসদ জোগায়। নদীর পাড়ের মানুষের জীবনও কত বৈচিত্র্যে ঘেরা। জেলে-জেলেনি, কৃষক-কৃষাণি, মাঝি কিংবা সম্ভ্রান্ত গৃহস্থ পরিবার, বাংলার সব প্রান্তিক মানুষের মূলই তো নদী। জেলে যখন নদীতে মাছ ধরতে যায়, তখন তার সঙ্গী হয় নৌকার মাঝি। আবার, নদীর বয়ে আনা পলিতে উর্বর হয়ে ওঠে তীরবর্তী ভূমি। সেই ভূমি কৃষককে দেয় ফসল। সেই সূত্রে নদী হয়ে ওঠে গ্রামীণ জীবনের মূল চালিকাশক্তি। তবে, নদীকে শুধু গ্রামীণ জীবনের ধারক বললে কথা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বিশ্বের যে বিশাল বিশাল নগরকেন্দ্রগুলো গড়ে উঠেছে, সবই আসলে নদীর হাত ধরেই।
নদীর পাড়ের জেলে, কৃষক কিংবা মাঝি শ্রেণির ভেতর থেকেই বণিক সমাজের উৎপত্তি। নদীর দেওয়া অপার ফসল,মৎস্য যখন সেই অঞ্চলের মানুষের চাহিদা মিটিয়ে ফেলল, তখন তা নদীর সাহায্যেই আবার ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে গেল। নদী হয়ে উঠল ব্যবসা-বাণিজ্যেরও প্রাণকেন্দ্র। মাত্র কয়েক শতাব্দী আগেও পৃথিবীতে মানুষের মূল সম্পদ ছিল ফসল কিংবা খাদ্য এবং খাদ্য উৎপাদনের সক্ষমতা। ফসলের সফলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে সেখানকার ভূমির ওপর। সে ক্ষেত্রে নদীমাতৃক বাংলার ভূমি এ অঞ্চলকে দিয়েছে সীমাহীন সম্পদের প্রাচুর্য। এর ধার ঘেঁষেই বিকশিত হয়েছে এখানকার শিল্প-সংস্কৃতিও। বাংলার ভাটিয়ালি,ভাওয়াইয়া, জারি, সারি সহ আরো নানান ধারার এত সমৃদ্ধ লোকজ গানের আবির্ভাব ঘটেছে নদীকেন্দ্রিক জীবন ও জীবিকার মধ্য থেকেই।
আর তাই বাংলার মানুষের জীবন ও জীবিকার কথা উঠলে বারবার নদীর কাছেই ফিরে যেতে হয়। কিছু শতাব্দী পূর্বেও বাংলা যে পুরো বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ জনপদ ছিল- তা হয়তো বর্তমান সময়ে অতটা আঁচ করা যায় না কিংবা বিশ্বাস করা যায় না। তথাপি, পৃথিবীর ইতিহাস পড়লে বিশ্বাস করতেই হয়। যার ফলে দেখা যায় প্রায় প্রতিটি সময় বিশ্বের প্রভাবশালী শাসকগণ বাংলার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন, বাংলাকে জয় করতে চেয়েছেন। আর এই ধারাটি কিন্তু এখনও রয়ে গেছে।
দেখা যায়, বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর এখনও একটি বিশেষ নজর রয়েছে বাংলার দিকে। নদীর দান করা বাংলার উর্বর সমৃদ্ধ ভূমি যে পৃথিবীর সকল কৃত্রিমতা ছাড়াও মানুষের খাদ্যের জোগান দিয়ে সংকটময় পরিস্থিতি সামলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, তা এই বঙ্গবাসীর জানা না থাকলেও যাদের দুটো ফসল ফলাতে নানা প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হয়- তারা বেশ ভালোভাবেই জানে। তবে, যে নদী আমাদের সারা পৃথিবীর কাছে সমাদৃত করল, সেই নদীর কতটা সমাদর আমরা করতে পেরেছি? নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা নগরের ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে নদীগুলো।
যে জীবন নদী দিয়েছে, সে জীবন গ্রহণ করে অকৃতজ্ঞের মতো অবহেলায়, অবলীলায় নদী ধ্বংসের খেলায় মত্ত হয়ে ওঠেছি আমরা। প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রতিশোধ প্রকৃতি নিজস্ব ভঙ্গিতেই নিতে জানে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নদী ভরাট, পানিদূষণ, নদীর পানি শাসন- এই সবই অবলীলায় করে যাচ্ছি। কিন্তু কতদিন সইবে নদী এই অনাচার?
লেখক : শিক্ষার্থী, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/187695