ফেসবুকে বন্দি মানুষ হারাচ্ছে চিন্তাশক্তি ও মূল্যবোধ
স্মার্টফোনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণীয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক দিনে দিনে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনকে এতটাই গ্রাস করে চলেছে যে এখন আমরা প্রায় ভুলতেই বসেছি আমাদের হৃদ্যতাপূর্ণ পারবিারিক জীবন বলে কিছু আছে। একটি সমীক্ষা বলছে-বিশ্বব্যাপী ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২০০ কোটির বেশি। পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও।
গবেষকরা বলছেন-এই ফেসবুক চালু হওয়ার ফলে মানুষ ক্রমশ পরিণত হচ্ছে অসামাজিক নিষ্ক্রিয় প্রাণিতে। ফেসবুক নিজেদের মধ্যে কোন গঠনমূলক বিষয়ে মত বিনিময়,সামাজিক কোন সমস্যা নিয়ে আলোচনা,নিজেদের দুঃখ কষ্ট আনন্দ বন্ধুদের সাথে শেয়ার করা, যুক্তিভিত্তিক কথা বলা,ব্যক্তিগত পর্যায়ে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার এটি চমৎকার প্লাটফরম হয়ে উঠতে পারতো। বিশেষ করে বাংলাদেশে তা কিন্তু হয়নি। এখন এটি হয়ে উঠেছে অনেকটা আজেবাজে মন্তব্য,গুজব,অসার তর্কাতর্কি,আলু ভর্তা বানানোর রেসিপির মতো হালকা বিষয়াদি,অনেক অর্থহীন রিল,টিকটক ইত্যাদিসহ হালকা বিনোদন বিতরণের একটা সুলভ অনলাইন ময়দান।
ফেসবুক দ্রতগতিতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে লাইক ও কমেন্ট অপসনটি চালু হওয়ার পর থেকে। বেশি বেশি লাইক পাওয়ার জন্য উস্কানিমূলক বা বিনোদনমূলক পোস্ট করার ঘটনা ঘটছে দেদারছে। আপলোডকৃত পোস্টে কতগুলো লাইক পড়লো, কে কী কমেন্ট করলো, সেসব দেখা ও পড়ার জন্য উদগ্রীব মন বারবার ফোনটি হাতে নেয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এ অনেকটা মাদকের নেশার মতো হয়ে গেছে এখন। অতিরিক্ত ফেসবুক ব্যবহারের কারণে পড়াশোনায় ছাত্রছাত্রীদের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা কমে আসছে বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন দেশের একজন প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ।
একটি জাতীয় দৈনিকে তিনি বলেছেন, আমি যা বলছি তারা সেটা শুনছে বটে কিন্তু বোঝার জন্য যে মস্তিষ্ককে কাজে লাগাতে হয়,সেখানে কাজ করছে অনীহা বা এক ধরনের আলস্য। কয়েক বছর আগে মাইক্রোসফট পরিচালিত এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে-স্মার্টফোন উদ্ভাবিত হওয়ার আগে মানুষের মনোযোগের স্প্যান ছিল ১২ সেকেণ্ড। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮ সেকেন্ডে।
জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে এভাবে মনোযোগের মাত্রা কমতে থাকলে প্রকৃত শিক্ষা অর্জনের হার স্বাভাবিকভাবেই কমে যাবে,যা একটি সুশিক্ষিত জাতিগঠনের বড় একটি অন্তরায় শুধু নয়, বড় ধরনের উদ্বেবেগের বিষয়ও। যুক্তরাষ্ট্রে একটি জরিপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি পাঁচটি ডিভোর্সের মধ্যে অন্তত একটির পেছনে ফেসবুকের ভূমিকা রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রীর পরস্পরের অজান্তে এমন সব নারী পুরুষের সঙ্গে একান্ত সম্পর্ক গড়ে তোলা হচ্ছে,যাকে এক কথায় বলা যায় অনৈতিকতা বা অবিশ্বস্ততা। আমাদের দেশেও বিবাহিত/অবিবাহিত তরুণ তরুণীর মধ্যে ফেসবুকের মাধ্যমে প্রতরণামূলক প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠছে, দেশ বিদেশ থেকে পাগলের মতো ছুটে আসছে তারা একে অপরের কাছে। অনেকক্ষেত্রে তাদের মোহভঙ্গও ঘটছে। আবার ফেসবুকের মাধ্যমে অনেক তরুণ তরুণীর মধ্যে প্রেমের নামে এমন সম্পর্কও গড়ে উঠছে ,যার উদ্দেশ্য বিয়ে নয়,নির্দিষ্ট কোথাও অনৈতিক বা অসামাজিক কার্যকলাপ,আবার কখনও কখনও অনৈতিক কাজ শেষে প্রতারিত মেয়েটিকে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনাও আমরা দেখছি বিভিন্ন পত্রপত্রিকাতেই। এতে করে ভেঙে পড়ছে সমস্ত মূল্যবোধ ও নৈতিকতা।
নেপোলিয়নক্যাট নামের এটি প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে সক্রিয় ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭ কোটি ১৯ লাখেরও বেশি। এর মধ্যে ১৮ থেকে ২৪ বছর পর্যন্ত ব্যবহারকারী ৩৯.১%। বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণায় দেখা যায়-দেশের তরুণ বয়সীদের প্রায় ৮৪ শতাংশ দৈনিক ২ থেকে ৬ ঘন্টা বা তার চেয়েও বেশি সময় ফেসবুকে কাটান। অনেকের তো পুরো রাতই পার হয়ে যায় ফেসবুকের স্ক্রিনে ,যাদের অনেকের সকাল হয় দুপুরে। এটা যে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর, তা অনেকের জানা থাকলেও এই ক্ষতিকর আসক্তি থেকে তারা বের হয়ে আসতে পারছে না বা বের হয়ে আসার রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক অনুশাসনও নেই দেশে। স্মার্টফোন,বিশেষ করে ফেসবুক থেকে রাতারাতি সরে আসার কোন বাস্তবতাও নেই এখন কিন্তু এর অতিরিক্ত ব্যবহার যে তরুণ-তরুণীসহ বড়দের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে,পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন করছে, অনৈতিকতার সয়লাব বইয়ে দিচ্ছে পরিবার ও সমাজে, সে ব্যাপারে ব্যাপক সচেতনতা গড়ে না তোলারও কোন বিকল্প নেই।
শিশুদের হাতে মোবাইল দেওয়ার বিষয়ে এর আগের একটি লেখায় বলেছি। তাই তাদের কথা বাদ দিয়ে বড়দের ফেসবুক ব্যবহারের নেতিবাচক দিকগুলোর বিষয়ে খানিকটা আলোকপাত করার চেষ্টা করেছি। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে ফেসবুকের আসক্তি এড়াতে ফেসবুক অ্যাপের সব ধরনের নোটিফিকেশন কিছুদিন পরপর বন্ধ করে রাখা যেতে পারে, যাতে অপ্রয়োজনে বারবার ফোন দেখার ইচ্ছে না জাগে। সারাদিনে কখন এবং কতক্ষণ ফেসবুক চালাবেন,তা নির্দিষ্ট করা যায়।
অলস সময়ে ফেসবুক না চালিয়ে বই পড়া,খেলাধুলা করা,বা পরিবারের সাথে আনন্দময় সময় কাটানোর অভ্যাস করা যায়। অনলাইনে চ্যাট না করে বন্ধুদের সাথে ফোনে কথা বলে বা সামনাসামনি দেখা করে আলাপচারিতায় মেতে ওঠা যায়।
ফেসবুক নিরবিচ্ছিন্ন মনোযোগ নষ্ট করে বলে কোন সিরিয়াস বিষয়ে মনোনিবেশ করা যথেষ্ট কঠিন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যক্তির চিন্তাশক্তি ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা। এমনকি আইকিউ লেভেলও কমতে থাকে ধীরে ধীরে। সম্মানজনক কাজ পেতে আইকিউ লেভেলের উচ্চতাও বড় একটা ফ্যাক্টর। এজন্য ফেসবুক বিনোদন লাভের পাশাপাশি জ্ঞানান্বেষণের কাজেও যতটা সম্ভব ব্যবহার করা দরকার।
লেখকঃ কবি, কথাশিল্পী ও কলামিষ্ট ,০১৭১১-০৫৫২৮১
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/187340