নকল ও ভেজাল খাদ্যে হুমকিতে জীবন
স্টাফ রিপোর্টার : ঝকঝকে মোড়ক, আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন আর কম দামের প্রলোভন—সব মিলিয়ে খাদ্যপণ্য কেনার সময় ক্রেতার পক্ষে আসল-নকলের পার্থক্য বোঝা বেশ কঠিন। বিশেষ করে শিশুদের-বিস্কুট, চকলেট, জুস ও গুঁড়া দুধ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন রান্নার তেল, মসলা, দুধ ও অন্যান্য নিত্যপণ্য নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।
কোথাও নকল মোড়কে পণ্য বিক্রির অভিযোগ, কোথাও নিম্নমানের উপাদান, আবার কোথাও খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও রঙ। এমন পরিস্থিতিতে খাবার কিনে নিশ্চিন্ত থাকতে পারছেন না ভোক্তারা।
খাদ্যে ভেজাল ও নকল পণ্যের বিস্তার শুধু ভোক্তার আর্থিক ক্ষতির বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের সাথেও সম্পর্কিত। তবে বাজারে কী পরিমাণ নকল ও ভেজাল খাদ্য রয়েছে, তার প্রকৃত তথ্য কোন কর্তৃপক্ষের কাছেই নেই।
এমনকি নামি-দামি ব্র্যান্ডের বিভিন্ন পণ্যেও মিলছে ক্ষতিকর প্লাস্টিক। শিশুর হাতে তুলে দেওয়া রঙিন বিস্কুট, এক গ্লাস জুস কিংবা এক প্যাকেট গুঁড়া দুধ—অভিভাবকের কাছে এগুলো সন্তানের পুষ্টি ও আনন্দের উপকরণ। কিন্তু সেই খাবারেই মিলছে ক্ষতিকর রাসায়নিক, অননুমোদিত রঙ, জীবাণু, অতিরিক্ত চিনি। এসব পণ্যে শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার পথেই বাধা তৈরি করছে।
বাজারে বিক্রি হওয়া-চকলেট, জুস, ললিপপ কিংবা আইসক্রিমের বড় অংশই বিষাক্ত পদার্থ দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। এসবের বেশিরভাগই তৈরি হচ্ছে-অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে, নিম্নমানের কাঁচামাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক দিয়ে।
কোনো ক্ষেত্রে কাপড়ের রঙ দিয়ে তৈরি হচ্ছে শিশুখাদ্য, আবার কোনো ক্ষেত্রে ডিটারজেন্ট, তেল ও অন্যান্য রাসায়নিক মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে নকল দুধ। শুধু তাই-ই নয়, এগুলোর অনুমোদন না থাকলেও পণ্যের মোড়কে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিএসটিআইয়ের লোগো।
ফলে এরকম খাবার হয়ে উঠেছে জীবনের জন্য গুরুতর হুমকি। এসব খাওয়ার কারণে নষ্ট করে দিচ্ছে কিডনি, লিভারসহ শরীরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। একই সঙ্গে এগুলো কমিয়ে দিচ্ছে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও।
বগুড়ার বিভিন্ন মুদি ও মনোহরি দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ম্যাংগো পুডিং, লিচি পুডিং, লিচি জেলি, লিচি ড্রিংস, আইবল, চকো চকোসহ হরেক রকম শিশুখাদ্য বিক্রি হচ্ছে। দোকানের সামনে বিভিন্ন পলিথিনে ঝুলানো রকমারি খাবারে আকৃষ্ট হচ্ছে শিশুসহ সব শ্রেণির ভোক্তা। এসবের কোন একটি পণ্যের মেয়াদ আট মাস, আবার কোনো খাবারের মেয়াদ আজীবন।
দেখা গেছে, অনেক পণ্যে নেই উপকরণের তথ্য, উৎপাদনের মেয়াদ বা উৎপাদনকারীর পরিচিতি। আবার কিছু পণ্যে কোম্পানির ঠিকানা থাকলেও বাস্তবে তার অস্তিত্ব নেই। ভ্যানে ফেরি করে দোকানে দোকানে এসব বিপজ্জনক ক্যাডবেরি, ডেইরি মিল্ক, স্নিকার্স, কিটক্যাটসহ বিদেশি সব ব্র্যান্ডের চকলেট সরবরাহ করা হচ্ছে। স্বাদ ও আকর্ষণীয় ডিজাইনের কারণে সহজেই শিশুরা এসব জিনিসপত্রের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বগুড়ার বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠেছে ভেজাল শিশুখাদ্য তৈরির কারখানা। ভেজাল পণ্যের একটা বড় অংশ আসে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে। এসব নিম্নমানের কাঁচামাল ব্যবহার করে গড়ে উঠেছে শত শত নকল খাবারের কারখানা।
সবচেয়ে বেশি ভেজাল ও নকল হচ্ছে শিশুখাদ্য। মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে এসব অসাধু ব্যবসায়ীদের ধরে জরিমানা বা কারাদন্ড দেওয়া হলেও পরে তারা আবারও একই কাজে লিপ্ত হচ্ছে। তথ্য বলছে, বগুড়াসহ দেশের প্রতিটি মুদি ও মনোহরি দোকানেই বিক্রি হচ্ছে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিকর উপাদানে তৈরি নকল ও ভেজাল খাদ্যপণ্য। এর মধ্যে বেশিরভাগই শিশুদের খাদ্যপণ্য।
বগুড়ায় জিলাপিতে ক্ষতিকর রাসায়নিক হাইড্রোজ ও খাবারে অননুমোদিত রঙ ব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক বেকারি, কাচ্চি ও চানাচুর কারখানায় অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছে। অভিযান চালিয়ে ভেজাল গুড়, মানহীন বেকারি পণ্য, অনুমোদনহীন পানি ও নকল প্রসাধনীর অনেক প্রতিষ্ঠান পাওয়া গেছে। সেখানে চিনি, চুন, ডালডা, আটা, কাপড়ের রঙ ও ফিটকিরি দিয়ে গুড় তৈরি করতে দেখা গেছে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জেলা কার্যালয় বগুড়ার অফিস প্রধান মো. রাসেল বলেন, অস্বাস্থ্যকর খাবারের কারণে বাংলাদেশে বিভিন্ন অসংক্রামিত রোগ বাড়ছে। এসব ভেজাল ও নকল খাদ্য তৈরি ও বিক্রি বন্ধে অভিযান চলছে। এই অভিযানের কঠোরতা আরও বাড়ানো হবে। নকল ও ভেজাল খাদ্য তৈরিকারী অসাধু ব্যবসায়ীদের কোন ছাড় নয়।
তিনি আরও বলেন, এসব নিম্নমানের খাদ্য পণ্য কেনা-বেচা বন্ধে আমাদের আরও সচেতন হতে হবে। মানুষের দীর্ঘদিনের অভ্যাসের কারণে একদিনে এসব বন্ধ করা সম্ভব নয়। জনবল সংকটের কথা উল্লেখ করে এই কর্মকর্তা বলেন, সরকারের অন্যান্য বিভাগের সাথে সমন্বয় করে খাদ্য নিয়ে এসব অপতৎপরতা বন্ধে আরও জোরালো অভিযান চালানো হবে। অভিযানের পাশাপাশি সচেতনতা বাড়াতেও বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই) আঞ্চলিক অফিস বগুড়ার সহকারী পরিচালক (সিএম) দেলোয়ার হোসেন বলেন, খাদ্যপণ্য ছাড়াও ৩৩৮টি পণ্যে মানসনদ নিতে হয়। অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যারা কোন প্রকার মানসনদ না নিয়েই বিএসটিআই’র লোগো ব্যবহার করেছে। অল্প কিছু সংখ্যক মানসনদ নিলেও অনেকেই নকল ব্যবহার করছে, তারা পুরো ঠিকানা না লিখে সংক্ষিপ্ত ঠিকানা ব্যবহার করে। তিনি আরও বলেন, এখন বিভিন্ন পণ্যে কিউআর কোড ব্যবহার হচ্ছে।
কোন ভোক্তা স্ক্যান করে ওই পণ্য সম্পর্কে সার্বিক তথ্য পেতে পারেন। এছাড়াও বিএসটিআই’র হট লাইন আছে, ফোন করেও কোন পণ্য সম্পর্কে তথ্য জানার ব্যবস্থা আছে। সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে এই কর্মকর্তা বলেন, ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্যের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভিযান চালিয়ে অপরাধ প্রমাণ সাপেক্ষে শাস্তি প্রদান করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বগুড়া আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে তিনটি জেলা-বগুড়া, জয়পুরহাট ও নওগাঁর কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। তবে কোন পণ্যের টেস্টিংয়ের জন্য এখনও ঢাকা-রাজশাহী যেতে হয়। বগুড়ারতে একটি ল্যাব হলে বিএসটিআই’র কাজের গতি আরও বাড়বে।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/187055