বগুড়ায় ৭১৯ মাদক কারবারির কাছে জনগণ জিম্মি, ২৬টি স্পটে প্রকাশ্যে চলছে কেনা-বেচা

বগুড়ায় ৭১৯ মাদক কারবারির কাছে জনগণ জিম্মি, ২৬টি স্পটে প্রকাশ্যে চলছে কেনা-বেচা

স্টাফ রিপোর্টার: বগুড়ায় পুলিশ ও ডিএনসি’র তালিকাভুক্ত ৭১৯ জন মাদক কারবারির কাছে শান্তিকামী জনগণ এখন জিম্মি। এদের অত্যাচার- উপদ্রবে সাধারণ মানুষ অতিষ্ট। আইনশৃংখলা বাহিনীর বার বার অভিযান সত্বেও মাদক কারবার থামছে না।

মহানগর ছেড়ে গ্রাম-গঞ্জেও ঢুকে পড়েছে মাদকের আগ্রাসন। মাদকে আসক্ত হচ্ছে শিশু-কিশোর- যুবক, নারী, স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীসহ সব বয়সী মানুষ। জেলার ৭১৯ জন কারবারি সেবনকারীদের হাতে মাদক নামে ‘বিষ’ তুলে দিয়ে কোটিপতি বনে যাচ্ছে। অন্যদিকে নি:স্ব হচ্ছে মাদকসেবীদের পরিবার। মাদকের টাকা সংগ্রহের জন্য অপরাধেও জড়িয়ে যাচ্ছে অনেকে। চুরি-ছিনতাইসহ সব ধরণের অপরাধ করতে দ্বিধা করছে না তারা।

ডিএনসির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বেসরকারি একটি সংস্থার জরিপে জানা গেছে সারাদেশে মাদকসেবীর সংখ্যা ৮২ লাখ। এর মধ্যে বগুড়া জেলায় মাদকসেবীর সংখ্যা অর্ধ লক্ষাধিক হবে। বগুড়ায় এই বিপুল পরিমাণ মাদকসেবীকে পুঁজি করে প্রতিদিন তাদের কাছে মাদক বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে মাদক কারবারিরা। দিনের পর দিন মাদক সেবনের ফলে কিডনি বিকলসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে ঝরে যাচ্ছে তারা।

তবে সরকার মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশব্যাপি ব্যাপক মাদক বিরোধী অভিযান শুরু করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বগুড়াতেও মাদক বিরোধী অভিযান চলছে। পুলিশ, ডিবি এসআরবি ও ডিএনসি’র সদস্যরা গাঁজা, মদ, ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল ও ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য উদ্ধার, কারবারিদের গ্রেফতার করছে।

সেইসাথে ভ্রাম্যমাণ আদালতে মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের বিভিন্ন মেয়াদি কারাদন্ডও দেয়া হচ্ছে। কিন্তু তারপরও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না এই কারবার। পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, মাদকের ব্যাপক চাহিদার কারনেই মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে সময় লাগবে। এব্যাপারে স্থানিয় জনগনকে এগিয়ে আসতে হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বগুড়া মহানগরে কমপক্ষে ২৬টি স্পটে মাদকের কারবার চলছে। সেইসাথে অনলাইনেও বেচাকেনা হচ্ছে বিভিন্ন মাদক। অনলাইনে ও মোবাইল ফোনে অর্ডার পেয়ে মাদক কারবারিরা মোটর সাইকেলযোগে গন্তব্যে গিয়ে সেবনকারীদের কাছে মাদক পৌঁছে দিচ্ছে। মাদকের বিস্তার  শুধু বগুড়া মহানগরেই নয়, বগুড়া সদর, শাজাহানপুর, নন্দীগ্রাম, শেরপুর, ধুনট,কাহালু, আদমদিঘী, দুপচাঁচিয়া, সোনাতলা, শিবগঞ্জ, মোকামতলা, সারিয়াকান্দি ও গাবতলী উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে-গঞ্জেও হানা দিয়েছে মাদক। মাদকের নেশায় বুদ হয়ে  ধংস হচ্ছে যুব সমাজ।

অনুসন্ধান করে জানা গেছে, বগুড়া মহানগরের চকসুত্রাপুর হাড্ডিপট্টিতে ৩টি স্পটে, চকসুত্রাপুর সুইপার কলোনীতে ১টি স্পটে, চামড়া গুদামলেনে ১টি, সেউজগাড়ী সুইপার পট্টিতে ২টি স্পটে, স্টেশন সড়কে রেলওয়ে মার্কেটের পিছনে সুইপার কলোনীতে ২টি স্পটে, সেউজগাড়ী আমতলা মোড়ের কাছে রেলওয়ে বস্তিতে ২টি স্পটে, সেউজগাড়ী পালপাড়ায় ২টি স্পটে, নবাববাড়ি সড়কে সদর পুলিশ ফাঁড়ির পিছনে ১টি স্পটে, পুরান বগুড়ায় ২টি স্পটে, উত্তর চেলোপাড়ায় ২টি স্পটে, ফুলবাড়িতে ১টি স্পটে, সুলতানগঞ্জপাড়ায় ঈদগাহ লেনে ১টি স্পটে, ঘোনপাড়ায় ১টি স্পটে, কাটনারপাড়ায় ১টি, বৃন্দাবনপাড়ায় ১টিস্পটে, বাদুড়তলায় ১টি স্পটে,  নিশিন্দারায় ২টি স্পটসহ মোট ২৬টি স্পটে মদ, গাঁজা, হেরোইন, ইয়াবা, ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেটসহ নানা ধরনের মাদকদ্রব্য প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে। শুধু এই স্পটগুলোই নয়, জেলার ১৩টি উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম গঞ্জেও ব্যাপক হারে মাদক কেনা বেচা হচ্ছে।

স্থানীয়রা বলেন, পুলিশ,এসআরবি,ডিএনসি বেশ কয়েকবার এসব স্পটে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমান মাদকদ্রব্যসহ তালিকাভুক্ত কারবারিদের গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে। কিন্তু দুই-তিন মাস কারাগারে থেকে আদালত থেকে জামিন নিয়ে বেরিয়ে এসে তারা ফের মাদক ব্যবসা শুরু করে। স্বাক্ষীর অভাবে ও আইনের ফাঁক ফোকর গলিয়ে  তারা আদালত থেকে জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বের হয়ে আসে।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) বগুড়া জেলা কমিটির নির্বাহী কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মাছুদার রহমান হেলাল বলেন, মাদক সামাজিক ব্যধিতে পরিণত হয়েছে। শুধু বগুড়া নয়, সারাদেশেই মাদকের বিস্তার ঘটেছে। তবে অভিযান চালিয়েই মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, এব্যাপারে জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, মাদক কারবারিদের কাছে জনগণ জিম্মি হয়ে গেছে। এদের বিরুদ্ধে জনগণ একত্রিত হয়ে  সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

এবিষযয়ে বগুড়া জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) হোসাইন মোহা: রায়হান বলেন, সরকার মাদক নির্মূলে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সারাদেশের ন্যায় বগুড়াতেও জোড়ালো অভিযান চলছে। পুলিশ মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা প্রস্তুত করে অভিযান চালাচ্ছে।

পুলিশের তালিকায় ৪৫১ জনের নাম রয়েছে। গত ৬ মাসে সেই তালিকার অনেক কারবারিকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। এব্যাপারে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) বগুড়ার উপপরিচালক মোহা: জিললুর রহমান বলেন, আমাদের লোকবল কম। সীমিত লোকবল দিয়েই  প্রতিদিন অভিযান চলছে। গ্রেফতার করা হচ্ছে তালিকাভুক্ত মাদক কারবারিদের।

তিনি বলেন তাদের তালিকায় ২৬৮ জন মাদক কারবারির নাম আছে। এর মধ্যে গত ৬ মাসে অনেক কারবারিকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সেইসাথে উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য। তিনি বলেন, এই অভিযান চলমান রয়েছে।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/186801