গণতন্ত্র ধরে রাখতে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের কাজে ফিরে গিয়ে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে হবে : ইকবাল হাসান মাহমুদ

গণতন্ত্র ধরে রাখতে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের কাজে ফিরে গিয়ে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে হবে : ইকবাল হাসান মাহমুদ

স্টাফ রিপোর্টার : বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, দীর্ঘ ১৫ থেকে ১৭ বছরের শাসনের পর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়েছে। ছাত্র-জনতা ও রাজনৈতিক নেতাদের সম্মিলিত আন্দোলনে এ পরিবর্তন এসেছে। গণতন্ত্র ধরে রাখতে হলে আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের নিজ নিজ কাজে ফিরে যেতে হবে এবং দেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে হবে।

আজ শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় বগুড়া শহরের টিটু মিলনায়তনে জুলাই-২৪ গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে স্মরণসভা ও আলোচনা অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি আরও বলেন, ৬৯ এর গণ-আন্দোলন, ৭১’এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ৯০ এর গণ আন্দোলনসহ দেশে যতবার আন্দোলন হয়েছে সব আন্দোলনে ছাত্রদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিলো উল্লেখযোগ্য।

আন্দোলন শেষে তারা সবাই তাদের শিক্ষাঙ্গন ও পড়ার টেবিলে ফিরে গেছে। কিন্তু ২৪’র গণ অভ্যূত্থানের তারা আর শিক্ষাঙ্গনে ফিরে না গিয়ে কিছু ছাত্রনেতা সরকারে যোগ দিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে দীর্ঘ ১৭ বছর আন্দোলনে বিএনপির ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী।

দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, সড়ক অবরোধ ও মবের মতো কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসতে হবে। দেশের আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা ও জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেছেন, এই সংকট থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে দেশে আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে। তিনি বলেন, বিশ্ব রাজনীতি এখন টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, জ্বালানি সংকটও দেখা দিয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সঠিকভাবে চলতে না পারলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপদের মুখে পড়তে পারে। এই ইরান যুদ্ধের ফলে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, সেখান থেকে পরিত্রাণ পেতে এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে আমাদের আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং দেশকে সঠিক পথে নিয়ে যেতে হবে।

সভায় প্রধান বক্তার বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনেক আহত জুলাই যোদ্ধাকে গেজেটভুক্ত করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন।

তিনি বলেন, ‘এটা দুঃখজনক হলেও সত্য যে অনেক আহত জুলাই যোদ্ধাকে শুধুমাত্র বিএনপি অথবা বিএনপির কোনো অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে গেজেটভুক্ত করা হয়নি। তাদের প্রাপ্য চিকিৎসাসুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এর ফলে অনেকেই স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া হলে আহত ব্যক্তিদের শারীরিকভাবে আরও সক্ষম করে তোলা সম্ভব হতো। যারা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে আহত ব্যক্তিদের গেজেটভুক্ত করেননি, তাদের এমন পদক্ষেপের নিন্দা জানান তিনি। ইশরাক হোসেন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির সম্পত্তি নয়। ছাত্রদের আন্দোলন দিয়ে শুরু হলেও পরে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নেন।

রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিলেন। কিন্তু একটি রাজনৈতিক দল জুলাইকে তাদের আন্দোলনের ফসল বলে দাবি করে জুলই নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। তাদের সঙ্গে বিগত ফ্যাসিষ্ট স্বৈরাচার সরকারের কোনো পার্থক্য নেই। তারা যেমন মুক্তিযুদ্ধকে একক তাদের কৃতিত্ব বলে দাবি করে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ব্যবসা করেছেন তেমনি একটি দল জুলাই তাদের দলের একক কৃতিত্ব দাবি করে চলেছেন।

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তরের মাধ্যমে আহত যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের পুনর্বাসনে কাজ করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হচ্ছে না। যারা বাদ পড়েছেন, তাদের আবেদন পুনরায় নেওয়ার জন্য সীমিত সময়ের জন্য কার্যক্রম চালু করা হবে।

‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ ও ‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’র মাধ্যমে আবেদন জমা দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল কিংবা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়েও আবেদন জমা দেওয়া যাবে। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, আহত জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাবলম্বী করে তোলার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন। যারা স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, তাদের প্রয়োজন ও দক্ষতা অনুযায়ী পুনর্বাসনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে একটি নতুন পরিকল্পনা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এতে প্রয়োজন অনুযায়ী কৃত্রিম অঙ্গ সংযোজন ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ১৭টি মন্ত্রণালয়কে নিয়ে গঠিত কমিটি এ বিষয়ে কাজ করছে।

রাজশাহী বিভাগীয় জুলাই-২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি ও আমরা জুলাই যোদ্ধা রাজশাহী নির্বাহী কমিটির আয়োজনে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী এমপি।

জুলাই-২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি, রাজশাহী বিভাগের সভাপতি উজ্জল হোসেন জোবায়েল এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন, জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান, বগুড়া জেলা পরিষদের প্রশাসক এ কে এম আহসানুল তৈয়ব জাকির, আরডিএ’র ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. আব্দুল মজিদ প্রামানিক, বগুড়া পৌরসভার সাবেক মেয়র এডভোকেট মাহবুবুর রহমান, বগুড়ার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. ফারজানুল হক নির্ঝর, জুলাই-২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি এর চেয়ারম্যান গোলাম রহমান, আমরা জুলাই যোদ্ধা সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আমিনুল ইসলাম ইমন, সাধারণ সম্পাদক রবিউল আওয়াল তুহিন ও বগুড়া জেলা ছাত্রদলের সভাপতি হাবিবুর রশিদ সন্ধান বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানে রাজশাহী বিভাগের জুলাই আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য ও জুলাই আহতদের হাতে ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/186793