নিকাব পরায় শিক্ষার্থীকে ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট-সন্ত্রাসী’ বলে অপবাদ ঢাবি শিক্ষিকার

নিকাব পরায় শিক্ষার্থীকে ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট-সন্ত্রাসী’ বলে অপবাদ ঢাবি শিক্ষিকার

ঢাবি প্রতিনিধি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে এক নিকাবপড়ুয়া শিক্ষার্থীকে অপমান, কটাক্ষ ও ‘সন্ত্রাসী’ বলে অপবাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবের বিরুদ্ধে। ঘটনার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিকভাবে ক্লাস বর্জন করেন।

মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) দুপুর ১২টায় ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের ক্লাস চলাকালীন এই ঘটনা ঘটে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ক্লাসে পূর্ণ পর্দা করা এক শিক্ষার্থীকে উদ্দেশ্য করে ওই শিক্ষক বলেন, এভাবে পর্দা করা যায় না, মুখ খোলা রাখা যায়, হাত-পা ঢাকতে হয় না। নিকাবের কারণে তিনি অস্বস্তি ও অনিরাপদ বোধ করছেন এবং ওই শিক্ষার্থী যেন সামনে না বসে, বরং সবার সঙ্গে পেছনে বসে। এ ঘটনার প্রতিবাদ করলে অভিযোগকারী শিক্ষার্থীর ওপরও চড়াও হন ওই শিক্ষক। এরপর ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ক্লাসরুম ত্যাগ করেন। সাথে সাথে আরও দুজন শিক্ষার্থী ক্লাস ছেড়ে বেরিয়ে যান। একপর্যায়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থী ক্লাস বর্জন করে প্রতিবাদ জানান।

শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, ওই শিক্ষক নিকাবপড়ুয়া শিক্ষার্থীকে বলেছেন, “তুমি কিভাবে ওকে সাপোর্ট করো? তুমি বলতে পারবে ও যে ফান্ডামেন্টালিস্ট না? ও সন্ত্রাসী না?” এছাড়া তিনি ক্লাসে বলেছেন, কুরআনে কোথাও নেই যে চোখ-মুখ ঢেকে পর্দা করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের তথ্য অনুযায়ী, এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের নানা অভিযোগ রয়েছে। ক্লাসে পড়াশোনার বাইরে ৫০ মিনিটের মধ্যে ৪৫ মিনিট গল্প করা, নিজের প্রশংসা করা, স্টুডেন্টদের গরীব মনে করে এলিটিজম নিয়ে লেকচার দেওয়া, শারীরিক অক্ষমতার কারণে টপিক ভুলে যাওয়া এবং অল্পতেই রেগে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ নিয়ে ঢাবি শিক্ষার্থীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক গ্রুপে সরব হয়েছেন বিভাগটির শিক্ষার্থীরা।

সুমি আকতার নামে এক শিক্ষার্থী লেখেন, উনার বামে বসা পরিপূর্ণ পর্দা করে আসা আমাদের ক্লাসমেটের উপর চড়াও হন। উনি বলেন, পর্দা এভাবে করে না, মুখ খোলা রাখা যায়, হাত-পা ঢাকতে হয় না।

এরপর বললেন, তিনি নাকি আনকম্ফোর্টেবল ও আনসেইফ ফিল করেছেন, কারণ নিকাব পড়া শিক্ষার্থী তাকে ডিস্ট্র্যাক্ট করছে। মেয়েটা যেন সামনে আর না বসে, সবার সাথে পেছনে বসে। তিনি আরও লেখেন, তখনই আমি প্রতিবাদ করলাম, ও ওর মাজহাব অনুযায়ী এভাবে পর্দা করতে পারে। শুরু হলো আমার উপর চড়াও হওয়া। মাজহাব উনি মানেন না, বেসিক মানবে সবাই, কিসের আবার মাজহাব? উনি ডিবেটে মামুনুল হককে হারিয়েছেন, আমি যেন কোনো তর্ক না করি। ম্যাম আবার মেয়েটাকে পেছনে যেতে বললেন। আমি আবারও বললাম, ওর কম্ফোর্ট হলে ও এভাবে নিকাব করতে পারে। ঘটনার একটি ভয়েস রেকর্ড সাংবাদিকদের হাতে এসেছে।

রেকর্ডে ২৪ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে শিক্ষককে বলতে শোনা যায়, “তুমি এমনভাবে কাপড় পড়বা যাতে শরীরের আকৃতি বোঝা যায়।” ২৮ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে বলা হয়, নেকাব করায় তিনি ডিস্ট্রাকটেড ফিল করছেন এবং অভিযোগ দিলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অথরিটি তার কিছু করতে পারবে না। ২৯ মিনিট ৩২ সেকেন্ডে নেকাব করায় শিক্ষার্থীকে ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’ ও ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেওয়া হয়।

বিভাগটির শিক্ষার্থীরা জানান, এই ধরনের বায়াসড আচরণ বছরের পর বছর ধরে চলছে। ইসলাম নিয়ে কটুক্তি করলেও কেউ প্রতিবাদ করেনি। কিন্তু আজ সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ায় তারা প্রতিবাদ জানিয়েছেন। একজন শিক্ষার্থী পর্দা করলে সে পড়াশোনা করতে পারবে না—এমন ধারণা ভুল। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শুধু চাকরির জন্য নয়, জ্ঞান অর্জনের জন্যও। ইংরেজি বিভাগের অন্য শিক্ষকদের অনেকেই শিক্ষার্থীদের পাশে থাকেন এবং মানবিক আচরণ করেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো ইংরেজি বিভাগকে দায়ী করা উচিত নয় বলেও মনে করছেন তারা।

এ বিষয়ে ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান তাজিন আজিজ চৌধুরি জানান, “আমি কালকে একাডেমিক কমিটির একটি ইমার্জেন্সি মিটিং ডেকেছি এবং আমরা তখন সিদ্ধান্ত নেব। স্টুডেন্টরা আমাদের বলেছে, তারা মাস্টার্সে তাকে একদম চাচ্ছে না। আমরা স্টুডেন্টদের আশ্বস্ত করেছি যে যত দ্রুত সম্ভব চেষ্টা করব, যেন তাদের সাথে তার কোনো ইন্টারঅ্যাকশন না হয়।”

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/186562