বগুড়ার নন্দীগ্রামে দম ফেলার ফুরসত নেই প্রতিমা তৈরির কারিগরদের
নন্দীগ্রাম (বগুড়া) প্রতিনিধি : আর মাত্র কয়েকদিন পরই শুরু হবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। পূজা যতই এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে তাদেও প্রতিমা তৈরির কারিগরদের ব্যস্ততা। বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার কারিগরদের এখন দম ফেলার ফুরসত নেই। বাঁশের কাঠামোয় খড় ও মাটির প্রলেপ দিয়ে একে একে গড়ে উঠছে দেবী দুর্গা, সিংহ ও মহিষাসুরের প্রতিমা।
কোনো প্রতিমার কাজ প্রায় শেষ, আবার কোনোটি এখনো চলছে মুখ ও হাতের সূক্ষ্ম কারুকাজ। এরপর রংতুলির ছোঁয়ায় পাবে পূর্ণতা । সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার বুড়ইল ইউনিয়নের দামুয়াপাড়া, ভাটগ্রাম ইউনিয়নের হাটকরইসহ বিভিন্ন এলাকার খোলা আঙিনায় রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষা করতে ছাউনি দিয়ে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে মাটির প্রতিমা।
কোথাও চলছে মাটির প্রলেপ, আবার কোথাও মুখমন্ডল ও হাত-পায়ের নিখুঁত কাজ। মাটি মাখা হাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। দশভুজা দেবি দুর্গার পাশে ক্রুদ্ধ মুখে দাঁড়িয়ে আছে মহিষাসুর, পাশে সিংহের অবয়ব। প্রতিটি প্রতিমায় ফুটে উঠেছে শিল্পীর দক্ষতা ও নিপুণতার ছাপ। হাটকরই এলাকার কারিগর রবি চন্দ্র রায় জানান, প্রায় ২৭ বছর ধরে তিনি প্রতিমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত।
তার বাবা-দাদারা কৃষিকাজ করতেন। তিনিও কৃষিকাজের পাশাপাশি প্রতিমা তৈরির কাজ করেন। মালঞ্চিপাড়ার কারিগর মথুর কীর্তনীয়ার কাছ থেকে প্রতিমা তৈরির কাজ শেখার পাশাপাশি শেরপুর উপজেলার বাবুল চন্দ্রের কাছ থেকেও এ কাজের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিনি। রবি চন্দ্র রায় বলেন, এ বছর তিনি মোট ১৩টি প্রতিমার অর্ডার পেয়েছেন।
এর মধ্যে নিজের আঙিনায় দুটি, নন্দীগ্রাম সদরে একটি, চাঁনপুরে দুটি, মাটিহাঁসে দুটি, হাটুয়া-আলাইপুরে একটি, গোন্দইলে একটি এবং শাজাহানপুর উপজেলার পালাল গ্রামে একটি, কাহালু উপজেলার খুরষট্টি গ্রামে একটি, বগুড়া শহরের জলেশ্বরীতলায় একটি ও বৌবাজারে একটি প্রতিমা তৈরি করছেন। কাজের চাপ সামলাতে তাঁর সঙ্গে পাঁচজন সহকারী কাজ করছেন। তিনি আরও বলেন, একটি প্রতিমা তৈরিতে প্রায় এক মাস সময় লাগে।
দপ্রকারভেদে প্রতিটি প্রতিমা তৈরিতে খরচ হয় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাজ করে ছোট প্রতিমার জন্য ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা এবং বড় প্রতিমার জন্য ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি পাওয়া যায়। কারিগররা জানান, বিভিন্ন উপকরণের দাম আগের তুলনায় বেড়েছে। মাটি, বাঁশ, খড় ও রঙের দাম বাড়ায় বেড়েছে উৎপাদন খরচ। ফলে পরিশ্রমের তুলনায় লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এ পেশার সঙ্গে যুক্ত অনেক কারিগরকে দুর্গাপূজার মৌসুমের বাইরে জীবিকা নির্বাহের জন্য কৃষিকাজসহ অন্যান্য কাজে যুক্ত হতে হয়।
স্থানীয়দের মতে, প্রতিমা তৈরি শুধু কারিগরদের জীবিকার মাধ্যম নয়, এটি এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ। হাটকরই এলাকার বাসিন্দা ও সহকারী শিক্ষক বিপুল চন্দ্র বলেন, পূজা যত এগিয়ে আসছে, প্রতিমা তৈরির দৃশ্য দেখতে স্থানীয় মানুষের আগ্রহও বাড়ছে। প্রতিমা তৈরির ব্যস্ততা এলাকায় উৎসবের আমেজ তৈরি করেছে। নন্দীগ্রাম উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি উত্তম কুমার বলেন, এ বছর উপজেলায় মোট ৪৮টি মন্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।
পূজাকে কেন্দ্র করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি পূজামন্ডপে নিরাপত্তার জন্য পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে। নন্দীগ্রাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তারিকুল ইসলাম বলেন, দুর্গাপূজাকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পূজামন্ডপ গুলোতে পুলিশি নজরদারি থাকবে।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/186557