গৃহযুদ্ধের ঝুঁকিতে ইসরায়েল, হতে পারে রাষ্ট্রের পতনও
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইসরায়েলে ঘনিয়ে আসছে আইনসভা নির্বাচন। আগামী ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনের আগে দেশটির আকাশে দেখা দিয়েছে বড় সংকটের ঘন কালো মেঘ। আসন্ন সংকটের অগ্রিম অশনিসংকেত জানিয়ে ইসরায়েলি সরকারকে সতর্ক করেছে ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। সাম্প্রতিক এক গোপন গোয়েন্দা মূল্যায়নে এই সতর্কবার্তা দিয়েছে সিআইএ।
মার্কিন সংস্থাটি বলছে, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সংকট আরও তীব্র হতে থাকায় গৃহযুদ্ধ কিংবা রাষ্ট্রীয় পতনের মতো মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে ইসরায়েল। গাজা, লেবানন ও ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতই মূলত এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) দুটি দায়িত্বশীল মার্কিন সূত্রের বরাতে অলাভজনক অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ড্রপ সাইট নিউজের প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সিআইএর বিশেষ বিশেষজ্ঞ ইউনিট ‘রেড সেল’-এর গোপন গোয়েন্দা মূল্যায়নে এই সতর্কবার্তা তুলে ধরা হয়েছে। প্রথাগত ধারণার বাইরে গিয়ে বিকল্প বিশ্লেষণধর্মী ‘অভ্যন্তরীণ ফাটল’ শীর্ষক আগস্ট মাসের ওই গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়, তীব্র হতে থাকা অভ্যন্তরীণ বিভাজনের কারণে ইসরায়েল এখন বড় ধরনের গৃহযুদ্ধ কিংবা অভ্যন্তরীণ ধ্বংসাত্মক সংঘাত থেকে ‘মাত্র একটি স্ফুলিঙ্গ দূরে’ রয়েছে।
তবে ওই গোয়েন্দা মূল্যালয়ে ইসরায়েলের ইহুদি নাগরিকদের ওপরই মূলত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ দেশটির জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থার বর্ণনানুযায়ী, এসব নাগরিক বিভিন্ন ধরনের বৈষ্যমের শিকার হচ্ছেন। সিআইএর এই মূল্যায়নে সেই বিষয়টি জায়গা পায়নি।
ড্রপ সাইট এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধ জানালেও সিআইএ কোনো সাড়া দেয়নি।
সিআইএর বিশেষজ্ঞরা ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে একত্রিত হওয়া বেশ কয়েকটি চরম চাপকে চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো ধসে পড়া অর্থনীতি ও রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি। অর্থাৎ গত দুই বছরে ফল ও সবজিসহ খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে ৯.৫ শতাংশ।
পাশাপাশি যোগ হয়েছে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ থেকে ফিরতে থাকা মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত (পিটিএসডি) হাজার হাজার সশস্ত্র সাবেক সেনাসদস্যদের উপস্থিতি, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার সাংবিধানিক সংকট এবং পশ্চিম তীরে উগ্র বসতি স্থাপনকারীদের মাত্রাতিরিক্ত সহিংসতা।
সবচেয়ে তীব্র বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে সামরিক পরিষেবায় যোগ দেওয়া নিয়ে। সাধারণ পরিবারগুলো যেখানে বছরের পর বছর ধরে রিজার্ভ সেনা হিসেবে যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে, সেখানে অতি-কট্টর ইহুদি পুরুষেরা রাষ্ট্রীয় বিপুল সুবিধা ভোগ করেও সামরিক সেবা থেকে বিশেষ অব্যাহতি পেয়ে আসছেন। এটি সাধারণ ইসরায়েলি সমাজের ক্ষোভকে চূড়ান্ত পর্যায় নিয়ে গেছে। রাজনৈতিক জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন জোগাড় করতে নেতানিয়াহুর জোট বা তার বিরোধী সুবিধা করতে পারছে না।
এদিকে সামরিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, অস্ত্রধারী ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সাবেক সেনাসদস্য এবং রাজনৈতিক চরমপন্থার এই ক্ষতিকর মেলবন্ধন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানির ‘ফ্রাইকোর্পস’ পরিস্থিতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যা অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধের আগুনে বাতাস দিচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গন ও প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রেও ক্রমশ একঘরে হয়ে পড়ছে ইসরায়েল।
সাম্প্রতিক পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে দেখা গেছে, অন্তত ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এখন ইসরায়েলকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভেতরেও তেল আবিবকে সামরিক ও আর্থিক অনুদান দিয়ে টিকিয়ে রাখা নিয়ে প্রবল হতাশা তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ইসরায়েলি প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কাঠামোর সঙ্গে নিজেদের আরও গভীরভাবে একীভূত করার চেষ্টা করছে, যাতে ভবিষ্যত মার্কিন সরকারগুলো সহজে তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে না পারে।
কিন্তু সিআইএর মূল্যায়নে সতর্ক করা হয়েছে যে, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে বিদেশি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো দেশটি থেকে পাতাড়ি গুটাতে পারে এবং আঞ্চলিক স্বাভাবিকীকরণ চুক্তিগুলো বাতিল হয়ে হামাস বা হিজবুল্লাহর মতো প্রতিপক্ষগুলো ইসরায়েলের এই অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগ নিতে পারে।
কয়েক দশক ধরে বিপুল অস্ত্রশস্ত্র ও মার্কিন সহায়তার ওপর ভর করে টিকে থাকা ইসরায়েল এখন অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের এমন এক চোরাবালিতে আটকে পড়েছে। এই পরিস্থিতি স্রেফ সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে সমাধান করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকরা।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/186456