দ্বিতীয় যমুনা সেতুর উপযুক্ত স্থান ও অ্যালাইনমেন্ট নির্ধারণে চলছে সমীক্ষা
স্টাফ রিপোর্টার : দেশের পরিবহন খাতের উন্নয়ন, আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে বহু প্রতীক্ষিত দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের (ফিজিবিলিটি স্টাডি) কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। প্রস্তাবিত এই সেতুর উপযুক্ত স্থান ও অ্যালাইনমেন্ট বা রুট নির্ধারণের জন্য ১২ মাসের সময়সীমা নির্ধারিত থাকলেও, নির্ধারিত মান বজায় রেখে ৮ থেকে ৯ মাসের মধ্যে সমীক্ষা শেষ করার তাগিদ দিয়েছে সেতু বিভাগ।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) সূত্রে জানা গেছে, এই মেগা প্রকল্পের আওতায় উত্তর, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং বিদ্যমান যমুনা সেতুর ওপর অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৩ সালের মধ্যে এই সেতু চালুর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। গত কিছুদিন আগে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে “যমুনা ও পদ্মা নদীর ওপর দ্বিতীয় যমুনা এবং পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষার পরামর্শক সেবা” শীর্ষক এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
বিবিএ’র প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল হোসেন এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সার্ম অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি ইঞ্জিনিয়ার মিয়া মোহাম্মদ কাইয়ুম নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
এই সমীক্ষায় যৌথভাবে কাজ করছে নেপালের এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট লিমিটেড (ইআরএমসি), সুইডেনের সুইডিশ ন্যাশনাল রোড কনসালটিং এবি, দক্ষিণ কোরিয়ার দাসান কনসালটেন্টস কো. লিমিটেড এবং বাংলাদেশের দেশ উপদেশ লিমিটেড (ডিইউএল) ও জেএস সার্ম অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড (সার্ম)।
এছাড়া দেশীয় প্রতিষ্ঠান টিলার সাব-কনসালটেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। সমীক্ষায় কারিগরি, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত, সামাজিক এবং আর্থিক বিষয়গুলোর বিস্তারিত মূল্যায়ন করা হবে। দ্বিতীয় যমুনা সেতুর জন্য বর্তমানে তিনটি সম্ভাব্য রুট বা করিডোর যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এগুলো হলো-বগুড়ার সারিয়াকান্দি থেকে জামালপুরের মাদারগঞ্জ রুট এই রুটটি বাস্তবায়িত হলে বগুড়া থেকে ঢাকার দূরত্ব প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার হ্রাস পাবে।
এছাড়া বিদ্যমান সেতু ঘুরে ময়মনসিংহ যাওয়ার দীর্ঘ পথও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। স্থানীয় প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গাবতলী-সারিয়াকান্দি-মাদারগঞ্জ হয়ে টাঙ্গাইলে সংযোগ স্থাপন করা হলে যাতায়াতের সময় ও ব্যয় উভয়ই সাশ্রয় হবে। স্থানীয় জনগণের দাবি ও বিভিন্ন মহলের জোরালো দাবির মুখে এই রুটের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
গাইবান্ধার বালাসী ঘাট থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাট: ১৯৩৮ সালে চালু হওয়া এই ঐতিহ্যবাহী রুটে একসময় রেলওয়ে ফেরি সার্ভিস চালু ছিল, যা নাব্যতা সংকটে ২০০৭ সালে বন্ধ হয়ে যায়। সেতুটি নির্মিত হলে গাইবান্ধা ও উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য জেলার সাথে রাজধানী ঢাকার দূরত্ব ১৪০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত কমে আসতে পারে। তবে এই অংশে নদীর প্রশস্ততা বেশি থাকায় নদী শাসন ও কারিগরি জটিলতা নিয়ে কিছুটা চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
নির্দিষ্ট এই দুটি রুট ছাড়াও প্রয়োজন সাপেক্ষে বিদ্যমান যমুনা সেতুর আশপাশে বা অন্য কোনো উপযুক্ত করিডোরও বিকল্প হিসেবে বিবেচনা রাখা হয়েছে। ১৯৯৮ সালে নির্মিত চার লেনের বিদ্যমান যমুনা সেতুর সংযোগ সড়ক ছয় লেনে উন্নীত হলেও মূল কাঠামো তুলনামূলক সংকীর্ণ হওয়ায় প্রায়ই দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এই যানজট নিরসন এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণে সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে প্রাথমিক অর্থ বরাদ্দ দিয়ে এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেছ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মিত হলে রাজধানী ঢাকার সাথে উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটবে। রাজধানী ও শিল্পাঞ্চলে কর্মরত উত্তরবঙ্গের লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষের কর্মঘণ্টা সাশ্রয়ের পাশাপাশি ঢাকায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ভোগান্তি কমবে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। সমীক্ষার প্রতিবেদন চূড়ান্ত হওয়ার পরই এই মেগা প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট রুট ও পরবর্তী বাস্তবায়ন পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে।
বগুড়া-১ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ কাজী রফিকুল ইসলাম এমপি জানান, বগুড়ার সারিয়াকান্দি থেকে জামালপুরের মাদারগঞ্জ রুটটির প্রতি তিনি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। শুধু বগুড়ার মানুষের নয়, এটি জয়পুর হাট, নওগাঁ, গাইবান্ধার দক্ষিণ অংশ, রংপুরের গাড়ি গুলো বগুড়ার সারিয়াকান্দি হয়ে মাদরগঞ্জ রুটটি পছন্দ করছে। এই রুটে ব্রিজ হলে তার দৈর্ঘ্য হবে ৫ থেকে ৭ কিলোমিটার। অন্যদিকে গাইবান্ধার বালাসী ঘাট থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত ব্রিজ হলে তার দৈঘ্য হবে ১২ থেকে ১৪ কিলোমিটার।
এতে খরচ প্রায় দ্বিগুন বাড়বে। নদীর ধরণ ও প্রকৃতি অনুযায়ী সারিয়াকান্দি থেকে ব্রিজ হলে তা ভালো হবে। এই সংসদ সদস্য আরও জানান, সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের (ফিজিবিলিটি স্টাডি) কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে। তারা সেতুর ব্যয়, জনগনের সুযোগ সুবিধা সব কিছু বিচার বিবেচনায় নিয়ে রিপোর্ট দিবেন।
তিনি বলেন, সেতু সারিয়াকান্দিতেই হবে এটা প্রায় নিশ্চিত। কারণ সারিয়াকান্দি-মাদারগঞ্জ রুটটি সর্বজনের কাছে গ্রহণযোগ্য। তিনি আরও বলেন, গাইবান্ধা বা ওই অঞ্চলের মানুষের যদি বেশি প্রয়োজন মনে করে তবে উভয় ঘাটের এবং উভয় জেলার মানুষের কথা বিবেচনা করে ওয়াই শেপ বা ওয়াই প্যাটান সেতু হতে পারে। ওয়াই শেপ হলে উভয় জেলার মানুষের স্বার্থ রক্ষা হবে। তবে যা হবে তা খরচ এবং জনগুরুত্বের উপর জোর দিয়ে করা হবে।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/186428