কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ২৫ চরের মানুষের একমাত্র ভরসা নৌকা
রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি : শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে প্রায় ৮ কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দিতে হয়। চারদিকে পানি, বালু আর বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। বর্ষায় তিস্তার পানি ও স্রোত বাড়লেই মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা। তখন নৌকাই হয়ে ওঠে চরবাসীর একমাত্র ভরসা। কোনো দিন নৌকা না পেলে স্কুলে যাওয়া বন্ধ, জরুরি রোগী হলে শুরু হয় উৎকণ্ঠা। এমন বাস্তবতায় কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার তিস্তার চরাঞ্চলের প্রায় ২৫টি চরের মানুষের জীবনযাত্রা চলছে চরম দুর্ভোগে।
বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের চর বিদ্যানন্দ, চর তৈয়বখাঁ, চর হায়বতখাঁ, চর পাড়ামৌলা, চর চতুরা, চর হংসধর, চর রামহরি এবং ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের চর খিতাবখাঁ, চর গতিয়াশাম, চর বগুড়াপাড়া, চর নাখেন্দা, শাওলার চর, চর নামাভরট, মাঝের চর, চর বড়দারগা, চর বুড়িরহাট, চর বড়ুয়াপাড়াসহ প্রায় ২৫টি চরের মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম নৌকা।
চরাঞ্চলের শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য কয়েকটি বিদ্যালয় থাকলেও মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়তে হলে তাদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। মাঝের চর থেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যেতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। এর মধ্যে প্রায় ৮ কিলোমিটার নদীপথ নৌকায় পাড়ি দিতে হয়। শুধু নদী পার হতেই সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। বর্ষাকালে পানি ও স্রোত বেড়ে গেলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। এতে কয়েকশ শিক্ষার্থীসহ চরাঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন চলাচলে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন জানান, চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কেউ চর ঢুসমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বগুড়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খিতাবখাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বুড়িরহাট আব্দুস সামাদ মন্ডল দাখিল মাদরাসা, সরকারবাড়ি মাধ্যমিক বিদ্যালয় কিংবা সরিষাবাড়ি আলিম মাদরাসায় পড়াশোনা করছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীর ওপারে হওয়ায় এবং যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল থাকায় অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না।
বিশেষ করে বর্ষাকালে নৌকা না পাওয়া, নদীর তীব্র স্রোত এবং ঘাটের সমস্যার কারণে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এতে তাদের পড়াশোনায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
চর গতিয়াশামের শিক্ষার্থী সুমাইয়া জানায়, প্রতিদিন তাকে যাতায়াতে নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বাড়ি থেকে বের হলেও নৌকা পেতে প্রায় ৯টা থেকে ১০টা বেজে যায়। এরপর নদী পার হয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে প্রায় সাড়ে ১১টা থেকে ১২টা বেজে যায়।
সুমাইয়া বলে, “এখানে একটি হাইস্কুল হলে আমাদের অনেক সুবিধা হতো। তার আগে নদী খনন করা দরকার। তাহলে বাড়িঘর ভাঙনের হাত থেকেও রক্ষা পাবে।”
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোছা. আর্জিনা খাতুন বলে, “আমাগো বাড়ি থেকে স্কুলে যেতে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। মাঝে মাঝে নৌকা থাকে না। ফলে সেদিন আর স্কুলে আসা হয় না। চরে পড়াশোনার সুবিধা না থাকায় অল্প বয়সে আমাদের মা-বাবা বিয়ে দিয়ে দেন। জীবনের স্বপ্ন থাকলেও সেটি পূরণ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।”
শিক্ষার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবাতেও পিছিয়ে রয়েছে চরাঞ্চলের মানুষ। সেখানে নেই হাসপাতাল কিংবা পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা। কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য কয়েক কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দিয়ে মূল ভূখণ্ডে যেতে হয়। জরুরি রোগীকে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। বর্ষাকালে নদীর স্রোত বেশি থাকলে এই সংকট আরও প্রকট হয়।
সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চরাঞ্চলগুলোতে বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস। এসব বাসিন্দাকে দৈনন্দিন যাতায়াতের জন্য জনপ্রতি প্রায় ৬০ থেকে ৮০ টাকা নৌকা ভাড়া দিতে হয়। ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে নৌকা ব্যবহার করতে গিয়ে বাড়তি ব্যয়ও বহন করতে হচ্ছে তাদের।
মাঝের চরের বাসিন্দা আবু তাহের বলেন, “আমাগো প্রতিদিন প্রায় ৮ কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দিয়ে গঞ্জে যেতে হয়। খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সহজে পাওয়া যায় না। তাই একসঙ্গে কয়েক দিনের প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে বাড়ি ফিরতে হয়। প্রয়োজনের সময় হাতের কাছে সবকিছু পাওয়া যায় না।”
চর গতিয়াশামের সাবেক ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের বিভিন্ন সময় সাহায্য-সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। বন্যার সময় ত্রাণ, বস্ত্র, বিশুদ্ধ পানি, টিউবওয়েল ও কোরবানির মাংসসহ বিভিন্ন সহযোগিতা দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে চরাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা, নদীভাঙনসহ বিভিন্ন সমস্যা অনেকটাই কমবে বলে আশা করা যায়।
চরবাসীর দাবি, দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ কমাতে স্থায়ী যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপদ নৌযাতায়াত, নৌ অ্যাম্বুলেন্স, মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করা জরুরি। বর্ষা এলেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এসব মানুষের জীবনমান উন্নয়নে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ চান তারা।
এ বিষয়ে রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিলা তাসনিম বলেন, “আমরা জেলা প্রশাসক স্যারসহ চরাঞ্চল নিয়ে কাজ করছি। চরের মানুষের জীবনযাত্রার মান কীভাবে উন্নয়ন করা যায়, সে জন্য উপজেলার প্রতিটি দপ্তরকে সেখানে কাজ করার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। চরের মানুষের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করা হবে।”
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/185477